//azoaltou.com/afu.php?zoneid=3651748 //azoaltou.com/afu.php?zoneid=3683887
top of page
Search

অভিনয়-অভিনেতা আর দর্শকের দূরত্ব ঘোচানোর কাজ চালিয়েছিলেন বাদল সরকার ' - শান্তনু সরকার

  • Feb 1, 2021
  • 8 min read

বাদল সরকার ও তাঁর ‘থার্ড থিয়েটার’: কিছু প্রাথমিক কথা।



শান্তনু সরকার


শুরুতেই জানিয়ে রাখি, এ লেখা বাদল সরকার সম্পর্কে কোনো গভীর আলোচনা নয়।

তাঁর কাজের রূপরেখা নতুনদের কাছে উপস্থাপন মাত্র।

যে তথ্যগুলো সাধারণত সকলেই জানে তবুও যা দিয়ে একটা লেখা শুরু করা দস্তুর

সেগুলো প্রথমে বলে নেওয়া যাক। বাদল সরকারের জন্ম ১৯২৫ সালে। পিতৃপ্রদত্ত

নাম সুধীন্দ্রনাথ সরকার। তিনি ছোটবেলা থেকেই নানাভাবে নাটক চর্চার সঙ্গে

যুক্ত ছিলেন। সেই সূত্রে ছোট নাটিকা রচনা করলেও সে অর্থে তাঁর প্রথম নাটক

হিসেবে ‘সলিউশন এক্স’ কেই বলা উচিৎ। তাঁর নিজের কথায়-‘একটা হাসির ছবি

দেখেছিলাম, নাম ‘মাঙ্কি বিজিনেস’... সেটাই সম্বল করে লিখে ফেললাম ‘সলিউশন

এক্স’, বলা চলে এইটাই আমার প্রথম নাটক। সিন্ডারেলা, শিবরামের গল্প,

বিরিঞ্চিবাবা, আগুন — এগুলোকে ধরছি না। সেটা ১৯৫৬ সাল।’

'থার্ড থিয়েটার' ভাবনায় পৌঁছোবার আগে প্রথমে তাঁর রচিত মঞ্চ নাটক নিয়ে একটি

সংক্ষিপ্ত খতিয়ান নেওয়া যেতে পারে। ‘সলিউশন এক্স’ এর পরে তাঁর রচিত দ্বিতীয়

নাটক ‘বড়ো পিসিমা’ ১৯৫৯ এ লেখা যার প্রযোজনা হয় নিজেদেরই সংস্থা ‘চক্র’র

মাধ্যমে ১৯৬০ সালে। এরপর ১৯৬৩ অবধি একের পর এক লিখে চলেছেন—

‘শনিবার’, ‘রাম শ্যাম যদু’, ‘সমাবৃত্ত’ (তাঁর একমাত্র ক্রাইম নাটক যা ছাপা হয়নি)

‘এবং ইন্দ্রজিৎ’, ‘সারারাত্তির’ প্রভৃতি নাটক। ১৯৬৫ সালে লিখলেন ‘বাকি

ইতিহাস’, তখন কলকাতাতে ‘শৌভিক’ প্রযোজনা করছে ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’, যে

প্রযোজনা তাঁর ভালো লাগেনি। সে সময় তিনি লিখেছিলেন ‘ বাঘ’ নামে একটি নাটক। এ

সময়ে কর্মসূত্রে তিনি ছিলেন নাইজেরিয়া। সেখানে থাকাকালীন তাঁর শেষ লেখা নাটক

‘পাগলা ঘোড়া’, যার 'মঞ্চ-সফল' প্রযোজনা করেছিল ‘বহুরূপী’। ‘বহুরূপী’র হয়ে তিনি

তাঁর লেখা নাটক ‘প্রলাপ’এর নির্দেশনাও দিয়েছিলেন, যদিও মাত্র একটি

প্রযোজনাই হয়েছিল এ নাটকের।

পরবর্তীতে তিনি প্রয়োজন অনুভব করলেন নিজস্ব নাটকের দলের, তৈরি হল

‘শতাব্দী’, নিজেদের নাট্য দল। ‘শতাব্দী’র প্রথম অভিনয় যদিও ১৯৬৮ সালে ২৩শে

জানুয়ারি ফারাক্কাতে। নাটক ‘কবি কাহিনী’। এরপর ‘শতাব্দী’র পক্ষ থেকে ১৯৭২

পর্যন্ত একের পর এক নাটক লিখে গেছেন যার মধ্যে বেশ কিছু আবার 'মঞ্চ-সফল'


নাটক। ১৯৭২ এ গিরিশচন্দ্র ঘোষের লেখা ‘আবু হোসেন’ এর এক ভিন্ন নাট্যরূপ যা

নিয়েছিলেন প্রসেনিয়াম মঞ্চের বাইরে প্রথম 'নিরীক্ষা- নাটকের' অভিনয়ের জন্য।

সত্ত্বেও প্রসেনিয়াম মঞ্চ থেকে এ সময়ে বেরিয়ে আসে ‘শতাব্দী’।

এরপর ‘শতাব্দী’র জন্য মঞ্চ নাটক হিসেবেই গৌরকিশোর ঘোষের গল্প

অবলম্বনে ‘সাগিনা মাহাতো’র কথা ভাবেন, কিন্তু পরে বদল করে তিনি এটিকে বেছে

নিয়েছিলেন প্রসেনিয়াম মঞ্চের বাইরে প্রথম 'নিরীক্ষা- না' অভিনয়ের জন্য।

এ তো গেল বাদল সরকারের মঞ্চ নাটক থেকে ‘থার্ড থিয়েটার’-এর সংক্ষিপ্ত

গতিপথ। এবার তাঁর এই ‘থার্ড থিয়েটার’-এর সম্পর্কে সংক্ষেপে

হঠাৎ কেন এই সরে আসা, কেনই বা তিনি এই নতুন ধারার প্রয়োজন অনুভব

করলেন? ‘থার্ড’ বা তৃতীয় যখন বলা হচ্ছে তা নিশ্চয়ই ‘ফার্স্ট’, ‘সেকেন্ড’ বা

প্রথম, দ্বিতীয় থিয়েটার বলে তাঁর মতে কিছু আছে, সেগুলি তবে কী, এ বিষয়ে

সংক্ষেপে তাঁর ভাবনা কিছু লেখা যাক।

প্রথমটি অর্থাৎ ‘ফার্স্ট’ থিয়েটার, তাঁর মতে দেশজ লোকনাট্য, অর্থাৎ

ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে লোকনাট্যের যে বিভিন্ন রূপ প্রচলিত আছে সেগুলি।

উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করছেন, উত্তরপ্রদেশে ‘নৌটঙ্কি’,কর্ণাটকে

‘যক্ষগান’, তামিলনাড়ুতে ‘থেরুকুটু’ প্রভৃতি ছাড়াও মহারাষ্ট্র, গুজরাট, কেরালায়

টিকে থাকা নানা লোকনাট্য'র কথা। তাঁর মতে বহুদিন ধরে প্রচলিত এই লোকনাট্যের

ধারাগুলো প্রবল জনপ্রিয় হলেও যে বিষয়বস্তু নিয়ে অভিনীত হয়ে চলেছে, তা মূলত

পরিত্যাজ্য।

লোকনাট্য আজও গ্রামাঞ্চলে জনপ্রিয়, কিন্তু সে লোকনাট্যের বিষয়বস্তু

প্রধানত পিছিয়ে থাকা অথবা প্রতিক্রিয়াশীল মূল্যবোধে ভারাক্রান্ত। দেবদেবীর

অতিলৌকিকতা অথবা রাজারাজড়ার উপাখ্যান সেখানে। অর্থাৎ এ জীবনে না

খেতে পাওয়া বা ক্ষমতাশালী'র অত্যাচার সহ্য করা- সবই ঈশ্বরের লীলা বা

পূর্বজন্মের কর্মফল বলে ধরে নিয়ে সহ্য কর, পরলোকে বা পরজন্মে মুক্তি আছে।

এই লোকনাটক গুলিতে 'রাজা' বা শাসক সমপর্কে যে ভাবনা প্রোথিত করা হয়েছে, তা

অনেকটা এরকম- রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি, রাজভক্তি পরমধর্ম, সুতরাং রাজা

খারাপ হলে একমাত্র পথ হল ভালো রাজা আনা। সেই কাজটাও ঈশ্বর করবেন,

প্রজাদের কিছু করবার নেই। এছাড়া সতীসাধ্বী স্ত্রী ও সর্বংসহা মাতার

উজ্জ্বল চিত্র এঁকে এ দেশের মেয়েদের প্রকৃত অবস্থা অর্থাৎ, পুরুষপদানত,

বাধ্যতামূলক নিকৃষ্ট যাপন, গৃহবন্দীত্ব, সামাজিক ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক


নিষ্ক্রিয় অবস্থান গুলিকে অনেক সময়েই সুন্দর মোড়কে ঢেকে রাখা হয় এ

নাটকগুলোতে।

অর্থাৎ মূলত দার্শনিকভাবে প্রগতি বিরোধী বা সাধারণ ব্যাপক মানুষের স্বার্থের

পক্ষে এই নাটক অবস্থান নেওয়ার বদলে বিষয়গতভাবে টিকে থাকা সমাজ

ব্যবস্থার বা ক্ষমতাসীনের পক্ষে এই নাটক অবস্থান নিচ্ছে বলে তিনি এই

নাট্যরূপ বা লোকনাটককে বা এর বিষয়বস্তুকে 'ফার্স্ট' বা প্রথম ধারার নাটক

বলছেন। যে ধারা থেকে তাঁর মতে সরে আসাই কাম্য।

‘দ্বিতীয়’ ধারার নাটক বলতে তিনি বোঝাচ্ছেন ঔপনিবেশিকতা সূত্রে

প্রাপ্ত নাট্য ধারাকে। যে ধারা মূলত শহরের মধ্যবিত্ত দ্বারা পরিপুষ্ট। তাঁর মতে

সেই ধারাটিও পরিত্যাজ্য। তিনি আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে, গ্রামের

লোকনাট্য'র তুলনায় শহরের থিয়েটারের বিষয়বস্তু ভিন্ন ভাবে নির্মিত হয়েছে।

সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীরা ও অন্যান্য সুবিধাভোগীরা

শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিল। তাদের পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই ক্রমে জমির আয় ও

অন্যান্য এই ধরণের আয় থেকে বঞ্চিত হয়ে সম্পূর্ণভাবে চাকরির ওপর

নির্ভরশীল, এক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্ম দিয়েছে এবং সেই শ্রেণীকে পুষ্ট

করেছে। কখনো সে মধ্যবিত্ত ক্রমে নিম্নবিত্ত হয়েছে। পরবর্তীতে নিজেদের

মুক্তির প্রয়োজনই সংগ্রামের পথে তাদের নিয়ে গেছে। এ সময়ে এসে শ্রমিক-

কৃষকের সংগ্রামের সঙ্গে এখন আর তাদের স্বার্থগত বিরোধ নেই। সেই কারণে এই

শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে প্রগতিশীল মূল্যবোধ ও ভাবধারার প্রকাশ

ঘটেছে। কিন্তু তাসত্ত্বেও এই প্রতিযোগিতামূলক সমাজ ব্যবস্থায় মধ্যবিত্তের

একান্ত চেষ্টা থেকেছে সর্বদাই নিজেকে আর এক ধাপ উপরে তোলার। এই ক্ষুদ্র

স্বার্থ তাকে বৃহত্তর স্বার্থ সম্বন্ধে অন্ধকারে রাখে, তাই সমাজের আমূল

পরিবর্তন ঘটিয়ে সামগ্রিক মুক্তির পথে না গিয়ে সে অন্যকে ডিঙিয়ে একা একা

উপরে উঠবার চেষ্টায় ব্যাপৃত হয়। ফলে শহরের থিয়েটারে প্রগতিশীল ভাবধারার

প্রকাশ যতই হোক, মধ্যবিত্ত দর্শকের মনে বড়োজোর একটা মানসিক উত্তেজনা

ওঠে, বিবেকের তুষ্টি ঘটে,সমাজপরিবর্তনে বিশেষ কোন সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে

না মধ্যবিত্ত। ফলে, দার্শনিক বোধের জায়গা থেকেই তিনি একটি বিকল্প

থিয়েটারের রূপের কথা ভেবেছিলেন, যা এই দুটির কোনটিই নয়। এখান থেকেই তাঁর

'থার্ড থিয়েটার' এর ভাবনা।

‘থার্ড থিয়েটার’ এই নামটি যদিও আমরা পৃথিবীর অন্যত্র থিয়েটার চর্চায় এর

আগেই ব্যবহৃত হতে দেখেছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থিয়েটারের প্রেক্ষিতে ‘রবার্ট


ব্রুস্টাইন’ বিশ শতকের ছয়ের দশকের মাঝামাঝি এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছেন।

ব্রুস্টাইন এর মতে, তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত থিয়েটারের মধ্যে

মূলত দুটি ধারার প্রাধান্য ছিল। একটি ধারা হল ‘excessive lightness’, যেটাকে তিনি

কোনোরকমভাবে গভীরতাহীন মূলত ফূর্তির জন্য রচিত কমেডির ধারাকে

বোঝাচ্ছেন। আরেকটি ধারা তাঁর মতে ‘excessive heaviness’, অর্থাৎ যে থিয়েটার

মূলত বুদ্ধিজীবীদের জন্য। গম্ভীর বা দার্শনিক নাটক। তাঁর মতে এই দুটি ছাড়াও

দুর্বল ভাবে হলেও তৃতীয় একটি ধারা ছিল। যাকে তিনি বলছেন-‘থার্ড থিয়েটার’।

‘fortunately, America has a third theatre, supported primarily by the

young, which combines the youthful properties of intensity, exuberance

and engagement’

উল্লেখ্য তিনি সেখানে তৎকালীন সময়ের এই ধারা বোঝাতে জুলিয়েন বেক ও জুডিথ

ম্যালিনা’র থিয়েটার কে বোঝাচ্ছেন।

এছাড়াও ‘থার্ড থিয়েটার’ শব্দটি পাচ্ছি Eugenio Barba র লেখাতে। তাঁর কাছে 1 st

Theatre — ‘the commercial and subsidized theatre’,

2 nd Theatre — ‘the established avant garde theatre’,

3rd Theatre — যা ,মানুষের জীবনের সারসত্যকে উপলব্ধির মধ্য দিয়ে দর্শকের

মধ্যে প্রোথিত করে দিতে চায়।

বাদল সরকার প্রস্তাবিত ‘থার্ড থিয়েটারে’ অবশ্য এর থেকে আলাদা। যদিও উক্ত

দুটি ধারার সঙ্গেই তাঁর সাক্ষাৎ পরিচয় ছিল।

এছাড়া পোল্যান্ডে গিয়ে তিনি Growtoski র, ‘Towards a poor theatre’ দেখেন।

তাঁর Theatre laboratory তে গিয়ে প্রযোজনা দেখেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলে থিয়েটার

বিষয়ে উদ্দীপিতও হন। গ্রতস্কি ছাড়াও তিনি জুলিয়েন বেকের পাঠানো ‘Life of the

Theatre’ দ্বারা প্রভাবিত হন। তিনি শেখনার দম্পতির আমন্ত্রণে ‘দি

পারফরমেন্স গ্রুপ’ এর কাজ দেখতে আমেরিকা ও কানাডাতে তাঁদের ‘ওয়ার্কশপ’

পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হন।

বিশ্ব থিয়েটারের নানা নিরীক্ষা মূলক ধারার সঙ্গে তাঁর পরিচয় থাকলেও, তাঁর

প্রস্তাবিত ‘থার্ড থিয়েটার’ এগুলির থেকে অনেক জায়গাতেই আলাদা। তাঁর মতে

একটি বিশেষ সময়ে, বিশেষ অবস্থায় একটি বিকল্প থিয়েটারের প্রয়োজন হচ্ছে


এমন কিছু ব্যক্তির যারা টিকে থাকা লোকনাট্য বা প্রচলিত থিয়েটার মাধ্যমগুলির

মধ্যে দিয়ে নিজেদের কথাটা সময় অনুসারীভাবে বলতে পারছে না।

তিনি এই থিয়েটারের রূপকে শুধু একটি নতুন ধরনের নাট্যশৈলী হিসেবে দেখতে

চাইছেন না। তাঁর ভাবনা অনুযায়ী, থিয়েটারের প্রাথমিক উৎস ও ভিত্তি হল কিছু

মতাদর্শগত অবস্থান। যেমন কী বলতে চাই, কেন বলতে চাই, কাকে বলতে চাইছি

এসব প্রশ্ন। ফলে বোঝাই যাচ্ছে এই থিয়েটার আসলে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির

প্রকাশ, একটি দর্শন, একটি আন্দোলন। তাঁর ভাবনায়-‘এই থিয়েটার গবেষণাগারে

প্রসূত একটি অভিনব নাট্যশৈলী নয়, পথে -ঘাটে পরীক্ষিত, যুগের ও সমাজের

প্রয়োজনে গড়ে ওঠা এক বিস্তীর্ণ আন্দোলন এই নাটকের ভিত্তি...... নাট্যশিল্প

বিক্রি করে যাদের খেতে হয় অথবা বিক্রি করে যারা সমৃদ্ধ হতে চায়, তাদের জন্য

এ থিয়েটার নয়, ‘Art for Art sake’ দের জন্যও এ থিয়েটার নয়। যে কোনো শিল্পই

কোনো না কোনো মতাদর্শের পক্ষে দাঁড়ায়’।

এই থিয়েটারের রূপ আলোচনা করতে গিয়ে তিনি প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত

করেন,

১.‘ফ্লেক্সিবল’ বা নমনীয়তা, অর্থাৎ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন অবস্থায় এ

থিয়েটার করা যাবে।

২. ‘পোর্টেবল’ বা সহজে বহনক্ষম, অর্থাৎ এই থিয়েটার নিয়ে সহজেই এক জায়গা

থেকে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া যায়। অর্থাৎ দর্শককে মঞ্চে এসে অভিনয় দেখতে

হবে এমন কোনো কথা নেই, প্রয়োজনে থিয়েটারকেই দর্শকের কাছে যেতে হবে।

‘ইনেক্সপেন্সিভ’ অর্থাৎ সুলভ বা কম খরচ সাপেক্ষ। অর্থাৎ এই থিয়েটার টাকার

ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল নয়। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা'র বিনিময় এর উপর

দর্শকের এই থিয়েটার দেখতে পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করবে না।

এই বৈশিষ্টগুলি ছাড়াও তিনি এই থিয়েটারের রূপ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে

'রিচুয়াল' এর প্রসঙ্গ আনেন। আদিম ‘রিচুয়াল’ গুলিই যে বর্তমান নাটকের আদিরূপ

এ বিষয়টি সাধারণভাবে গৃহীত। প্রসঙ্গক্রমে তিনি থিয়েটারের সঙ্গে রিচুয়াল এর

ঘনিষ্ট সম্পর্কের কথা বলেন। তবে তিনি যে রিচুয়ালের কথা বলেছেন সেটি কোনো

অলৌকিকতায় বিশ্বাসী গোষ্ঠীর সংস্কারজাত রিচুয়াল নয়। অলৌকিকতা বাদ দিয়েও

রিচুয়ালের অন্যতম দুটি অঙ্গ হল উদ্দেশ্য প্রণোদিত ক্রিয়া এবং অভিনেতা ও


দর্শকের যৌথ অংশগ্রহণ। তিনি রিচুয়াল এর এ দুটি অঙ্গকে ‘থার্ড থিয়েটার’এ

গ্রহণ করার কথা বলেছেন।

নাটককে দর্শকের কাছে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি আবার দুটি রূপের উল্লেখ

করেছেন। যখন বন্ধ ঘরে নির্দিষ্ট সংখ্যক দর্শকের সামনে অভিনয় হচ্ছে তখন

তিনি এটিকে বলছেন ‘অঙ্গনমঞ্চ’। অর্থাৎ থিয়েটার যেখানে প্রসেনিয়ামের চালু

মঞ্চ ছেড়ে অঙ্গনে নেমে আসছে। যেখানে দর্শক এবং অভিনেতার অবস্থান একই

তলে। যেখানে অভিনেতারা দর্শকের তুলনায় ভিন্ন তলে বা উপরে অবস্থান করছে না।

যেখানে অভিনেতা এবং দর্শকের অভ্যস্ত দূরত্বটাকে ভেঙে দেওয়া হচ্ছে তলের

ভিন্নতাকে ভেঙে দিয়ে। আরেকটি রূপকে তিনি বলছেন ‘মুক্তমঞ্চ’ যেখানে খোলা

জায়গায় অভিনয় হচ্ছে, যেখানে দর্শক সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়। একশ বা এক হাজার যা

খুশি হতে পারে। থিয়েটার সেখানে মঞ্চের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেয়েছে।

এই ধরণের নাটকের ভাষা কি হবে তা নিয়েও তিনি দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। শুধু

চর্চাই নয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দর্শক-অভিনেতার সংযোগ স্থাপনে নতুন

নাট্য ভাষার উদ্ভাবনও ঘটিয়েছেন। যার মূল কথা, সমাজ নির্দিষ্ট ক্ষমতা

কাঠামোর অধীনে থাকা চিহ্ন ব্যবস্থা ভিত্তিক সংযোগ সম্পর্কের উপর সম্পূর্ণ

নির্ভর না করে সে সংযোগ সম্ভাবনাকে কিভাবে আরও সমৃদ্ধ, ব্যাপক, সর্বজনীন

করা যায় তা। এর প্রয়োজনে তিনি তথাকথিত অর্থহীন শব্দ, শারীরিক অঙ্গভঙ্গি

বা বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করেছেন তাঁর নাটকে। এ প্রসঙ্গে তিনি নাটকের ভাষার

বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করে দেখান কীভাবে ন্যাচারালিস্টিক থিয়েটারের সময়

থেকে মুখের ভাষাই সংযোগ স্থাপনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠলো। তার মতে সভ্যতা

বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ যত জটিল হয়েছে, মানব সমাজে পারস্পরিক ভাব

বিনিময়ে স্পর্শের ব্যবহারের বদলে ধীরে ধীরে মুখের শব্দ নির্ভর চিহ্ন ব্যবস্থা বা

সংকেতের ওপর অতিনির্ভরতা তৈরি হয়েছে। শরীরের অন্যান্য অংশের সঞ্চালন যেন

শুধু মুখের ভাষাকেই জোরালো করবার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজ

ব্যবস্থায় ‘সভ্য’, ‘সংস্কৃত’, ‘মার্জিত’, নাগরিকের প্রধান লক্ষণ যেন প্রবল

উচ্ছাসেও পরিমিত মাথা নাড়া। এর অন্যথা হলেই সমাজের চোখে হেয় হতে হয়। তৃতীয়

থিয়েটার এই কৃত্রিম ভাষা ব্যবহার থেকে মুক্তির কথা বলে। এখানে মুনজের ভাষার

সঙ্গে শরীরের ভাষা আলাদা করেই ভাব বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। শুধুমাত্র

মুখের ভাষাকে স্পষ্ট করাই এখানে শরীরের ভাষার কাজ নয়।

বাদল সরকারের থিয়েটারের এই যে নিরীক্ষা, এই যে অবস্থান, সেটি কিন্তু হঠাৎ

করে গ্রহণ করা কোনো অবস্থান নয়। 'থার্ড থিয়েটার' শিকড় হীন কোনো ভাবনা


নয়। আমরা যদি নিরীক্ষামূলক থিয়েটারের প্রেক্ষিতে বাদল সরকারের থিয়েটার

বিষয়ক ভাবনা প্রসঙ্গে আলোচনা করি, তাহলে বলা যায়, শুধু আমাদের দেশে

বিচ্ছিন্নভাবে নয়, থিয়েটার নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা সারা পৃথিবী জুড়েই নানা

সময় চলেছে। রিচুয়ালের সঙ্গে যুক্ত অভিনয় ক্রিয়া (পারফরমেন্স) থেকে বর্তমান

থিয়েটারের সময়কাল পর্যন্ত থিয়েটারের বিষয়বস্তুই শুধু নয়, অভিনয় রীতি এবং

অভিনয় উপস্থাপন পদ্ধতিরও ঘটেছে নানা পরিবর্তন। রেনেসাঁসের প্রভাবে

থিয়েটারে শুধু বিষয়বস্তু নয়, উপস্থাপন রীতি বা নাট্য মঞ্চের ধারণাতেও ঘটেছে

নানা পরিবর্তন। মধ্যযুগ পর্যন্ত যে মঞ্চ ধারণা ছিল তার বদলে প্রসেনিয়াম

আর্কের আবির্ভাব, থিয়েটার করার জন্য আলাদা জায়গা তৈরি বা পুঁজিবাদী

সভ্যতার দর্শন অনুযায়ী দর্শকের অর্থনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী নাট্য আলয়ে

নতুন বসার ব্যবস্থা হয়েছে। তবে বিশ শতকের দুটি বিশ্বযুদ্ধ শিল্প সংস্কৃতির সব

ধারাতেই নানা ধরনের পরিবর্তন এনেছিল। আসলে বিশ্বযুদ্ধ মানুষের মনন জগতে

এমন অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল যে পুরনো বিশ্বাসের জগতে মানুষ আর আস্থা রাখতে

পারছিল না। এই সময় ‘ আভা গার্দ’ ( Avant Garde) থিয়েটারের শুরু। যে থিয়েটার

আন্দোলন বাস্তববাদী থিয়েটারের ধারাকে অস্বীকার করে থিয়েটারের নতুন

উপস্থাপন রীতি নিয়ে ব্যাপক নিরীক্ষা শুরু করে।

এ প্রসঙ্গে বোধ হয় প্রথম নাম করতে হয় ‘মেয়ারহোল্ড’ (Vsevold Meyerhold)

এর। তিনিই প্রথম পুরোনো ধারার বাস্তববাদী থিয়েটারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা

করে থিয়েটার নিয়ে নানা নিরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেন।‘ঘোস্ট’ প্রযোজনাতে প্রথম

মঞ্চের সামনের পর্দা ব্যবহার করা থেকে শুরু করে থিয়েটারে সংলাপের

আধিপত্যের বিরোধী ছিলেন তিনি। অভিনয়কে তিনি শুধু মঞ্চের মধ্যে সীমাবদ্ধ না

রেখে অর্কেস্ট্রা পিটের কিছু অংশকেও তিনি অভিনয়ের কাজে লাগাতে শুরু করেন।

তিনি তাঁর অভিনেতাদেরকে প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত দর্শকদের মাঝে গিয়ে অভিনয়

করার নির্দেশ দিতেন। মঞ্চের নির্দিষ্ট পরিসরকে ভেঙে ফেলা বা অভিনেতা-

অভিনেত্রীদের সঙ্গে দর্শকদের নতুন ধরনের সম্পর্ক তৈরির মধ্যে দিয়ে তিনি

পুরোনো বাস্তববাদী থিয়েটারের ভাষাকে অনেকটাই ভাঙতে সক্ষম হন।

এই ধারাবাহিকতাতেই যারা পরবর্তীতে নিরীক্ষামূলক থিয়েটারকে এগিয়ে নিয়ে

গেছেন বা থিয়েটারের নতুন ভাষা নির্মাণে সচেষ্ট থেকেছেন। এঁদের মধ্যে

উল্লেখযোগ্য হলেন, Vaktanghov, Antonin Artaud, Okholopkov, Jerzy

Grotowsky, Julian & Judith Beck, Allan Kaprow, Chaikin, Peter Brook

প্রমুখ।


পুরোনো মঞ্চের ধারণাকে ভেঙে দিয়ে Okholopkov দর্শকের মাঝে এমনভাবে তাঁর

থিয়েটার উপস্থাপন করেন যাতে দর্শকরাও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে

প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ফেলে। অভিনয় প্রাঙ্গনকে তিনি কখনো গোল, কখনো

চতুষ্কোণ কখনো আবার ষড়ভুজের আকৃতি দেন। তিনি থিয়েটার প্রাঙ্গনকে এমন

একটা জায়গাতে পরিণত করতে চেয়েছিলেন যেখানে দর্শক এবং অভিনেতা-

অভিনেত্রীর হাতে হাত মিলিয়ে একাত্ম হতে পারবে।

গ্রটস্কির কথা আগের লেখা হয়েছে। বাদল সরকার তার প্রযোজনা দেখেছিলেন।

‘রিয়ালিস্টিক থিয়েটার’ এর বিরুদ্ধে গ্রতস্কি’র বক্তব্য ছিল যে সিনেমা এমনভাবে

বাস্তবতাকে উপস্থাপন করতে পারে যা কখনোই থিয়েটারের পক্ষে সম্ভব নয়, ফলে

সিনেমা বা টেলিভশন আবিষ্কারের পরে থিয়েটারের এমন কিছু খোঁজা উচিত, সিনেমায়

যার উপস্থাপন করা সম্ভব নয়।

বিশ শতকের ছয়ের দশক ছিল আমেরিকার ইতিহাসে এক বিশেষ সময়পর্ব। নিউক্লীয়

অস্ত্রবিরোধী আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলন, সমকামী আন্দোলন,

অন্যদিকে হিপিদের উত্থানের মধ্যে দিয়ে সে সময় আমেরিকান সমাজেও

সার্বিকভাবে এক বিকল্প পরিসর খোঁজার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। থিয়েটারের

ক্ষেত্রেও এই বিকল্প পরিসর সৃষ্টির তাগিদেই নতুন প্রযোজনা পদ্ধতি। তাঁদের

কাজের সঙ্গেও বাদল সরকারের সরাসরি পরিচিতি ছিল।

এই তথ্যগুলি এখানে উল্লেখের যে উদ্দেশ্য তা হল এটা বলতে চাওয়া যে সারা পৃথিবী

জুড়েই থিয়েটারের নতুন উদ্দেশ্য খোঁজার একটা প্রচেষ্টা বিশ শতকের মধ্যবর্তী

প্রায় পুরো সময় ধরেই লক্ষ্য করা যায়। এবং এই খোঁজের যে মিলের জায়গা তা হল

প্রত্যেকেই দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের একটা চেষ্টা চালাচ্ছিলেন।

পুরোনো ধরনের প্রযোজনাতে দর্শকদের সঙ্গে অভিনেতাদের যে দূরত্ব, সরাসরি

সংযোগের অভাব, তাকে প্রত্যেকেই ভেঙে ফেলতে চাইছিলেন। এই ধারাবাহিকতাতেই

আমাদের দেশে বাদল সরকারের এই প্রচেষ্টা, যা এই দেশেও ব্যাপক উৎসাহ সৃষ্টি

করেছিল। তৈরি হয়েছিল ‘থার্ড থিয়েটার’এর ধারায় অসংখ্য থিয়েটার দল, যাদের

কেউ কেউ এখনও কাজ করে চলেছে।

 
 
 

Comments


Subscribe to Site

Thanks for submitting!

© 2020 Bhaan Theatre | Designed by Capturegraphics.in
bottom of page