আমাকে অনুপ্রাণিত করেন পঙ্কজ ত্রিপাঠী" ব্যক্তি ও অভিনয় জীবনকে পরখ করে লিখলেন - অজন্তা সিনহা
- Mar 10, 2021
- 4 min read
Updated: Mar 11, 2021

অজন্তা সিনহা
অনুপ্রাণিত করেন এন এস ডি'র এই প্রাক্তনী
পঙ্কজ ত্রিপাঠিকে আমি প্রথম লক্ষ্য করি 'চিল্লার পার্টি' ছবিতে একটি ছোট চরিত্রে, এক মন্ত্রীর
ব্যক্তিগত সহকারী। অল্প কয়েকটি দৃশ্য, সামান্য সংলাপ---তাতেই মাত ! মনে পড়ছে কি অসাধারণ শরীরী
অভিনয় ! সচরাচর এই জাতীয় চাকরি যারা করে, তাদের মধ্যে চাটুকারিতা, হীনমন্যতার লক্ষণগুলি আচার-
ব্যবহারে ঘন ঘন প্রকাশ পায়। পঙ্কজ অসামান্য দক্ষতায় সেই বিষয়টি ফুটিয়ে তোলেন। এরপর তাঁকে আরও
অনেক বেশি বেশি দেখতে পাব পর্দায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র চিত্রনে, আমার এই সাধ পূর্ণ হয়নি। কারণ, বলিউড
তো বলিউডই ! পঙ্কজের মতো 'বহিরাগত'দের সেখানে সহজে জায়গা হয় না।
ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামার এই প্রাক্তনীর ফিল্মি সফর শুরু (হিন্দি ছবি / তার আগে একটি কন্নড় ছবিতে
কাজ করেন ) ২০০৪-এ, 'রান' ছবিতে একটি ছোট্ট চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। তারপর বিশাল ভরদ্বাজের
'ওমকারা', সেখানেও তাঁকে খেয়াল করে না কেউ। হিসেবমতো, প্রথম তিনি নজর কাড়ার সুযোগ পান অনুরাগ
কাশ্যপের 'গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর' সিরিজে, ২০১২'তে, একটি নেগেটিভ চরিত্রে কাজ করে। প্রসঙ্গত,পঙ্কজ
অভিনয় করেছেন ৬০টির বেশি ছবি ও সেই একই সংখ্যক টিভি সিরিজে। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলি
হলো 'মিথ্যা','শৌর্য', 'অপহরণ','মশান', 'বরেলি কি বরফি','ফাকরে','নিউটন','স্ত্রী'। এর মধ্যে 'নিউটন' ও
'স্ত্রী'তাঁকে যথার্থ ফুটেজ দেয় এবং পঙ্কজ তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেন। এছাড়া, সোনি টিভি'র 'পাউডার'-এ
ড্রাগ কিং নাভেদ আনসারির চরিত্রে পঙ্কজের অভিনয় ভোলেনি ছোটপর্দার দর্শক। তবে, সাম্প্রতিককালে
পঙ্কজের সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসার কারণ নিঃসন্দেহে পরপর ওয়েব দুনিয়ায় আসা দু'দুটি দুর্দান্ত
ক্রাইম সিরিজ---'মির্জাপুর' ও 'স্যাক্রেড গেমস'।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নেগেটিভ চরিত্রগুলিকে পর্দায় জীবন্ত করে তুললেও, আদতে নিপাট ভদ্রলোক এই
অভিনেতা। আদ্যন্ত পারিবারিক বন্ধনে বিশ্বাসী পঙ্কজ তাঁর উত্থানের মুখ্য কৃতিত্ব দেন স্ত্রী মৃদুলাকে।
বলিউডে জায়গা করে নেওয়ার কঠিন লড়াইয়ের দিনগুলিতে মৃদুলা সম্পূর্ণ ভাবে তাঁর পাশে ছিলেন। চাকরি করে
সংসার চালিয়েছেন। যাতে পঙ্কজ নিশ্চিন্তে তাঁর অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন পূর্ণ করতে পারেন। একটি
সাক্ষাৎকারে পঙ্কজ বলেছেন, "আজও, আমরা একে অপরের পরিপূরক। থাকবোও চিরকাল। আমি শুটিং শেষে
বাড়ি ফিরতেই অভ্যস্ত। কোনও তথাকথিত 'সোশ্যাল লাইফ' নেই আমার। ফিল্মি পার্টিতে সচরাচর যাই না।
বন্ধুবান্ধব যারা, তারাও যে সবাই ইন্ডাস্ট্রির তা নয়। যে হোটেলে কাজ করতাম, পাটনা গেলে আজও সেখানে
যাই। পরিচিতদের সঙ্গে দেখা করি। ভালো লাগে।"

এন এস ডি, ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা ! অভিনয়ক্ষেত্রে আজও দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নাম । এখানে
সুযোগ পাওয়ার জন্য তামাম স্বপ্ন দেখা তরুণকুল অপেক্ষা করে। এই এন এস ডি'তে পঙ্কজের এন্ট্রি, সেও
যেন এক সিনেমার গল্প। কি ছিল তাঁর জীবনযাপন, কোন পটভূমিতে এই মহার্ঘ দরজা নিজের জন্য খুলে ফেললেন
তিনি একদিন, শুনুন পঙ্কজের নিজের মুখেই। "অভিনয় করবো এমন কোনও স্বপ্ন দেখার কথা ভাবতেই পারতাম
না সেদিন। নিম্নবিত্ত এক কৃষক পরিবারের ছেলে আমি। তেমন লেখাপড়া শেখার সুযোগও পাইনি। বারো ক্লাস
পাশ করেছি। ক্ষেতের জন্য একটি ট্রাক্টর কেনা খুব দরকার। কিন্তু বাবার কাছে টাকা নেই। তখন বাবা
বললেন, তাহলে শহরে যাও, ডাক্তারি পড়ো। ডাক্তার হতে পারলে আর্থিক কষ্ট দূর হবে। পরে ট্রাক্টর কেনা
যাবে। তো, ডাক্তার তো হতে পারলাম না, পাটনায় এসে অ্যাক্টর হয়ে গেলাম।"

ওঁর কথায়, জীবনে কোনও কোনও সময় না পাওয়াটা আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। সে সময় ট্রাক্টর কেনার পয়সা ঘরে
থাকলে পঙ্কজের আর গ্রামের বাইরে আসা হতো না। বাইরে আসার দিন থেকেই অবশ্য কঠোর সংগ্রাম।
সেদিনের স্মৃতি উদ্বুদ্ধ করে তাঁকে আজও, বার বার জানিয়েছেন পঙ্কজ। গ্রাম থেকে প্রতিদিন ভোরে ৭
কিলোমিটার পথ হেঁটে স্টেশনে পৌঁছতে হতো ট্রেনে পাটনা আসার জন্য। এদিকে ডাক্তারি পড়ার সুযোগও তো
ক্ষমতার বাইরে। সেখানেও তো পয়সা, প্রভাব ইত্যাদির খেলা। শেষে শেফের ট্রেনিং নিয়ে পাটনার এক হোটেলে
কাজ শুরু করলেন। সারাদিন কাজ, সন্ধ্যায় থিয়েটার। জীবনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো তখনই। আর অন্য
এক লড়াইয়েরও শুরু।
এন এস ডি'তে প্রবেশের জন্য আরও ছয়-ছয়টি বছর অপেক্ষা করতে হলো পঙ্কজকে। সেখানে ভর্তির ন্যূনতম
যোগ্যতা স্নাতক। তাঁর তো সেই ডিগ্রি নেই। ভর্তি হলেন কলেজে। তিন বছর পর স্নাতক হয়ে আবার চেষ্টা।
ভাগ্যে শিকে আর ছেঁড়ে না। কিন্তু হতাশ হননি। লড়ে গেছেন। এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন,"আমার
সামনে তখন অনুপ্রেরণা নাসিরুদ্দিন, ওম পুরি, অনুপম খেরের মতো অভিনেতা। এঁরা সকলেই এন এস ডি'র।
অভিনয় যদি শিখতে হয়, এখানেই। আর প্রত্যাখ্যান ? তার জন্য তো শৈশব থেকেই প্রস্তুত আমি। হ্যাঁ, বাবার
সমর্থন পেয়েছিলাম। ওঁর শুধু একটাই প্রশ্ন ছিল, এখান থেকে পাশ করে চাকরি মেলে তো ? আমি আশ্বস্ত
করেছিলাম এই বলে, যে, সরকারি চাকরি পাব,শিক্ষকতা করার সুযোগ থাকবে। কলেজ তো বটে ! কিছু তো শিখছি!
জানি না সামনে কি আছে তখন। এটা জানতাম, কিছু একটা করবোই। আমার সরল সাদাসিধে বাবা সেকথা বিশ্বাস
করেন। পরিবারে একজন শিক্ষক, মন্দ কি !"( হাসি)
ছয় বছর পর এন এস ডি'র দরজা খুললো। পঙ্কজ তাঁর স্বপ্ন পূরণের প্রথম ঘাটটি পার হলেন। পঙ্কজের বাবা
নিশ্চয়ই আজ ছেলেকে নিয়ে যথেষ্ট গর্বিত। সারা দেশের সিনেমা,টিভি ও ওয়েবদুনিয়ার দর্শক আজ চেনে
বিহারের সেই অজগ্রামের ছেলেটিকে। তাঁকে নিয়ে নিঃসন্দেহে গর্বিত এন এস ডি'ও। হতাশ করেননি পঙ্কজ।
নাসির-ওমের ব্যাটন যোগ্য হাতেই পড়েছে, আজ তা প্রমাণিত।
আমাদের এই কলম মূলত ওয়েবসিরিজ কেন্দ্রিক। সিনেমা-টিভিতে পঙ্কজের অভিনয় স্বীকৃতি পেলেও,
'মির্জাপুর' ওয়েবসিরিজ যে তাঁর অভিনয়ের এক অন্য অভিমুখ খুলে দিয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এই
সিরিজের জন্য (আই রিল) সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন তিনি ২০১৯'এ। কলীন ভাইয়ার চরিত্রে
পঙ্কজের অভিনয় এককথায় আন্তর্জাতিক মানের, একথা এখন দায়িত্ব নিয়েই বলা যায়। নেটফ্লিক্স,
আমাজন প্রাইম, ডিজনি হটস্টারের কল্যানে আমরা সবাই এখন এই পরিমাপটি করতে সক্ষম। 'মির্জাপুর'এর
দুটি সিজনেই তিনি কামাল করা অভিনয় করেছেন। কার্পেট ব্যবসার আড়ালে ড্রাগচক্র চালায় অন্ধকার দুনিয়ার
বেতাজ বাদশা কলীন ভাইয়া। নেগেটিভ রোলকেও কতটা বুদ্ধিদীপ্ত, বিশ্বাসযোগ্য ও আকর্ষণীয় করে তোলা
যায়, পঙ্কজের অভিনয়ের মুন্সিয়ানায় তা প্রতিভাত এখানে, প্রতি পর্বে, দুটি সিজনেই। উত্তরপ্রদেশের
অপরাধ দুনিয়ার নিখুঁত চালচিত্র 'মির্জাপুর'-এর তৃতীয় সিজনের ঘোষণা হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। টানটান এই
গ্যাংস্টার ড্রামায় কলীন ভাইয়া থুড়ি পঙ্কজ ত্রিপাঠির উপস্থিতি নিয়ে কোনও সন্দেহ রাখছেন না ওয়েব
দুনিয়ার দর্শক।
প্রতিষ্ঠা, জনপ্রিয়তা কোথাও আচ্ছন্ন করেনি এই চরম বাস্তববাদী অভিনেতার মননকে। সম্প্রতি এক
সাক্ষাৎকারে বলেছেন, "আমার অভিনয় যদি আমার সহ অভিনেতাদের মধ্যে হীনমন্যতা বোধ জাগিয়ে তোলে,
তাহলে আমি বরং নিজের অভিনয়ের মান নামিয়ে আনবো।" নিজের কাজের প্রতি কতটা নিয়ন্ত্রণ থাকলে একজন
শিল্পী একথা বলতে পারেন, বুঝতে অসুবিধা হয় না। তারই সঙ্গে ধরা পড়ে তাঁর ভাবনা ও চেতনার ব্যাপ্তি,
উদারতা ও পরিণতমনস্কতা। প্রসঙ্গত,এদিন সাংবাদিক মহোদয়ের প্রশ্ন ছিল, "শুনেছি,আপনি সেটে থাকলে
আপনার সহ অভিনেতারা নাকি আত্মবিস্বাস হারিয়ে ফেলে। এটা কি সত্যি ?" সাংবাদিকরা এই জাতীয় প্রশ্ন
করেই থাকে। বিশেষত বিনোদন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে চমক ও বিতর্ক সৃষ্টির এটা চিরন্তন পন্থা। আমি নিজে
দীর্ঘদিন বিনোদন সাংবাদিকতায় থেকে এসব দেখতে ও শুনতে অভ্যস্ত। ফিল্মি তারকারা বেশিরভাগ সময়েই
এতে সাধারণত বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখান। প্রতিক্রিয়ার আবার জবাবী প্রতিক্রিয়া। চাপানউতর শুরু। অর্থাৎ
সাংবাদিকের উদ্দেশ্য সফল। কিন্তু পঙ্কজের ক্ষেত্রে সেটা হলো না। উনি হেসে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে যেটা
বললেন, সে তো আগেই বলেছি।

শোনা যায়,সেটে যাওয়ার পর পরিচালকরা নাকি পঙ্কজকে স্ক্রিপ্ট হাতে ধরিয়ে বলেন, উনি নিজের মতো শট
দিতে পারেন। এটা কি সত্যি ? জবাবে বিনয়ী পঙ্কজ,"আসলে ওঁরা আমার ওপর ভরসা করেন। যদিও আমি
ডিরেক্টরস অ্যাক্টর। একটা কথা বলতে পারি, নিজের অভিনয়ের কৃতিত্ব দেখানো নয়, আমি চেষ্টা করি
প্রতিটি দৃশ্য যেন উপভোগ্য হয়। ছবির বার্তা যা-ই হোক, তার প্রকাশভঙ্গি নিরস হলে দর্শক দেখবে না।
আমি সেকথা মাথায় রেখেই পুরো বিষয়টাকে মজাদার করার চেষ্টা করি।" ওঁর সহ অভিনেতা তো বটেই, পরিচালক
থেকে স্পটবয়, সকলেই পঙ্কজের গুণমুগ্ধ এই কারণেই। আদতে পঙ্কজের মতো গুণী 'বহিরাগত'রা যে বলিউডের
রক্তমাংসের শরিক হয়েছেন, তা ইন্ডাস্ট্রির জন্যও যথেষ্ট স্বাস্থ্যকর। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শহর-
গ্রামের, এমনকী প্রত্যন্ত অঞ্চলের নতুন প্রতিভারাও সাহস ও বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে আসবে তো পঙ্কজের
মতো অভিনেতাদের দেখেই। পরিপুষ্ট হবে ভারতের অভিনয় জগৎ। আর দর্শকের প্রাপ্তির ঘর ? সেখানে তো
শুধুই তৃপ্তির জোয়ার !
Make a Donation
A/C: 40910100004585
IFSC Code:BARB0BUDGEB
Bank Name: Bank Of Baroda
Name in Bank: BHAAN





Comments