‘আমাদের নিজেদের স্বার্থে খাঁটি স্বদেশি সিনেমা’ - সুমন সাধু
- Mar 31, 2021
- 2 min read

একদিকে কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের অধ্যাপক ফাদার ল্যাফো বিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্য
আনিয়েছেন একটি বায়োস্কোপ। অন্যদিকে স্টিফেন্স নামে এক ইংরেজ ভদ্রলোক কলকাতার স্টার থিয়েটার
মঞ্চে বায়োস্কোপ দেখাতে শুরু করেছেন। বায়োস্কোপের আগমন সম্পর্কে কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে ছাড়া
হয়েছে হ্যান্ডবিল। বলা হচ্ছে, “পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য! বায়োস্কোপ! আসুন! দেখুন! যাহা কেহ কখনও
কল্পনাও করেন নাই, তাহাই সম্ভব হইয়াছে। ছবির মানুষ, জীব-জন্তু জীবন্ত প্রাণীর ন্যায় হাঁটিয়া ছুটিয়া
বেড়াইতেছে...।”
অন্যান্যদের মতো বায়োস্কোপ দেখে বিস্মিত হলেন হীরালাল সেনও। বিশদে জানার জন্য নিজেই চলে গেলেন
স্টিফেন্স সাহেবের কাছে। কিন্তু ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে হীরালালের সামনে মুখ খুললেন না
সাহেব। তাতে অবশ্য দমে গেলেন না হীরালাল। বিদেশ থেকে বায়োস্কোপের যন্ত্রপাতি জোগাড় করে এনে তা
দেখাতে শুরু করে দিলেন। এবং কালক্রমে হয়ে উঠলেন বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রাণপুরুষ।

সখের ফটোগ্রাফি থেকে সিনেমা তৈরির কাজে মেতে গিয়েছিলেন তরুণ হীরালাল। নিজেকে আত্মনিয়োগের কাজটি
ছিল ভয়ংকর। স্যার সুরেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের বিরোধী বক্তৃতার কিছু ছবি তুলেছিলেন
হীরালাল। খবর চলে গিয়েছিল ব্রিটিশদের কাছে। মতিলাল সেই খবর পৌঁছে দিয়েছিল গোপনে। এরপরেই ঘটে যাবে
চরম বীভৎস ঐতিহাসিক ঘটনাটি। হীরালাল সেনের ছবির গুদামে আগুন লাগানো হবে। এতদিন ধরে যা ছিল
‘দুর্ঘটনা’, পরিচালক অরুণ রায় তাই-ই সত্যি বলে প্রকাশ করবেন।
কে এই অরুণ রায়? ‘হীরালাল’ ছবির পরিচালক। কিছুদিন আগেই ছবিটি মুক্তি পেয়েছে। চিত্রনাট্যও তাঁর। নিখুঁত
গবেষণার মাধ্যমে ঘটনা পরম্পরায় তিনি এঁকেছেন তাঁর হীরালাল-কে। ইতিহাসকে বিকৃত না করে। খুবই দক্ষতার
সঙ্গে তুলে এনেছেন কয়েকটি ঐতিহাসিক সত্য। যার জন্য অরুণবাবুর কাছে ঋণী থাকা উচিত বাংলা চলচ্চিত্র
মহলের৷ আগেও দুটি ছবি বানিয়েছিলেন, ‘এগারো’ আর ‘চোলাই’। ‘চোলাই’ ছবিটিকে রিলিজ করতে দেওয়া হয়নি
নানা রাজনৈতিক কারণে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, তাঁর এই তিনটি ছবিই ভীষণভাবে রাজনৈতিক। সেই কারণে
আলাদাভাবে নজর কেড়েছেন অরুণ রায়।

ছবিতে তথ্যের খুঁটিনাটির ভ্রান্তি আছে কি নেই সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। তার চাইতেও বড়ো কথা পরিচালক
অবিমৃষ্যকারী বাঙালির হয়ে কাজটি করলেন। কয়েকটি কথা না বললেই নয়, পুরোনো কলকাতার আমেজ তেমন
পাওয়া যায়নি ছবিতে। কিছু মিছিল দেখতে অবাস্তব লাগে। পুরো ছবির কালার টোন যেন ফ্যাকাসে। সাম্প্রতিক

বাংলা ছবির এই এক সমস্যা, সাউন্ড এবং কালারে আলাদা করে কেউই খরচ করতে চান না। কালার প্যালেটের
বাইরে যদিও হীরালাল ছবির সাউন্ড বা শব্দভাবনা ভালো লেগেছে। ময়ূখ ও মৈনাকের আবহ একেবারে মানানসই।

ভালো লেগেছে অনুষ্কা চক্রবর্তীর হেমাঙ্গিনী, তন্নিষ্ঠা বিশ্বাসের কুসুম, অমরেন্দ্রনাথের চরিত্রে অর্ণ
মুখোপাধ্যায় এবং মতিলালের চরিত্রে পার্থ বিশ্বাসকে। আলাদা করে বলতে হবে হীরালালের চরিত্রে অভিনেতা
কিঞ্জল নন্দর নাম। ঐতিহাসিক হীরালালকে তিনি প্রাণ দিয়েছেন। সিনেমা-শেষে তাঁর অভিনীত চরিত্রের পাশে
দু-দণ্ড জিরিয়ে নেওয়া যায়। এতটাই গুরুত্বপূর্ণ অভিনয় করেছেন কিঞ্জল। আশা করব, ভবিষ্যতে এরকম
অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের অংশ হবেন তিনি। হারিয়ে যাবেন না। ঠিক যেমন আশা করব পরিচালক অরুণ রায়
হারিয়ে যাবেন না। বাংলা ছবির দুর্দশার দিনে তাঁদের প্রয়োজন আছে। তাঁরা প্রযোজক পাবেন না, ডিস্ট্রিবিউটার
পাবেন না, সিনেমা হল পাবেন না, হয়তো তেমন দর্শকও পাবেন না; কিন্তু যে জেদটা থাকবে তা বাংলা ছবির
ইতিহাসে অধ্যায় হয়ে থেকে যাবে। থেকে যাবে যুগের চিহ্ন হয়ে। হীরালাল তো আসলে একজন কেউ নন, ২০২১
সালেও কত কত শিল্পীর কাজ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। তবুও বাঙালি স্বপ্ন দ্যাখে। লড়াই করে। যেমনটা এক
শতাব্দী আগে করেছিলেন হীরালাল সেন। বাংলা চলচ্চিত্রের জনক। আমাদের শপথ নিতে হবে, এই মানুষগুলোকে
আমরা যেন না ভুলি। অরুণ রায় এবং তাঁর টিম-কে কুর্নিশ।
Make a Donation
A/C: 40910100004585
IFSC Code:BARB0BUDGEB
Bank Name: Bank Of Baroda
Name in Bank: BHAAN





Comments