।।আর্ট ভার্সেস কমার্সিয়ালে বিশ্বাস ছিলনা সৌমিত্রের।।
- Dec 30, 2020
- 3 min read
সমস্ত কিছুর মধ্যে প্রতিপক্ষ খোঁজা বাঙালির এক চিরন্তন অভ্যাস। মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল এর উন্মাদনা তারা সর্বক্ষেত্রে খুঁজে পেতে চান। প্রতিপক্ষ যদি সত্যিই প্রতিপক্ষ হয় তাহলে তাকে প্রতিপক্ষ বলাতে অন্যায় নেই। কিন্তু কেবলই প্রতিপক্ষের মৌতাত পাওয়ার জন্য কোনো কিছুকে তলিয়ে না দেখে বিরুদ্ধতার বয়ান তৈরি করা আদতে সত্যের থেকে দৌড়ে পালানো। এ বড়ো কাজের কথা নয়। আর্ট বনাম কমার্শিয়াল সিনেমা, গ্রুপ বনাম ব্যাবসায়িক থিয়েটার কে অনেকদিন ধরেই আর একটু তলিয়ে দেখার প্রস্তাব রাখছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আমরা তেমন করে শুনতে চাইনি।
যে প্রস্তাব সৌমিত্র রাখেন তার সবটুকু মেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে না। তিনি সুঅভিনেতা ছিলেন বলেই তারে প্রস্তাব সর্বোতো সুন্দর হবে, এমন কোন প্রস্তাব এখানে রাখতে চাইছিনা। শুধু বলতে চাইছি সৌমিত্রের এই দ্বৈরথ তুলে দেবার প্রস্তাব এর ভেতরে যেটুকু সংগ্রহযোগ্য, তার থেকে কেন বা নিজেকেবঞ্চিত রাখি?

সৌমিত্র জানান চলচ্চিত্রের সঙ্গে চলচ্চিত্র ব্যবসায়ী একেবারে শুরুর দিন থেকেই সংশ্লিষ্ট হয়ে গেছে।
চলচ্চিত্র নির্মাণের যা ব্যায় তা সাধারণ এক শিল্পীর পক্ষে ঘাড়ে নেওয়া শক্ত। তার জন্য দরকার প্রযোজক। এবং প্রযোজনার দায় সামলানোর জন্য প্রযোজকের লভ্যাংশের হিসেব বুঝে নেওয়াও খুব অন্যায় কিছু নয়। তার মাঝে দাঁড়িয়েই সৌমিত্র ভালো ছবি ও খারাপ ছবির দ্বৈরথ কে সামনে এগিয়ে দিতে চান। আমাদের বুঝিয়ে দেন আর্ট ফিল্ম এর ধারণা নিয়ে ছবি মাত্রই যেমন ভালো নয়, ব্যবসায়িকভাবে সফল ছবি মাত্রই তার শিল্পগুণ নেই; একথাও ঐতিহাসিকভাবে অসত্য। পথের পাঁচালীর ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায় কোটি কোটি ব্যবসা করার তথ্য দিয়ে সৌমিত্রের বিনীত প্রশ্ন এই বিশ্বখ্যাত ছবিকে আপনি কোন কোঠায় রাখবেন!? পথের পাঁচালী আর্ট ফিল্ম নয়? আবার পথের পাঁচালী কি বাণিজ্য সফল নয়? শারদীয়া আজকাল এ প্রকাশিত একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে এমনই অনেক অসংখ্য জরুরী প্রশ্নের পরপর অবতারণা করতে থাকেন সৌমিত্র। প্রমাণ করার চেষ্টা করেন আসলে শিল্পকে ভালো এবং মন্দের দ্বৈরথ দিয়েই দেখা উচিত, অন্য কিছু দিয়ে নয়। তাহলে শিল্প ব্যাখ্যার কালে, গ্রহনের সময়, শিল্পকে আমাদের প্রি-অকুপাইড মাইন্ড সেট শিল্পের সুন্দরকে, শিল্পের তাৎপর্যকে বদলে দিতে পারে যা কাম্য হতে পারে না।সেই সমস্ত বুদ্ধিজীবী তার আক্রমণের বিষয় হয়ে ওঠেন, যারা শিল্প ব্যাখ্যার কালে কুলীন ব্রাহ্মণ এর মত আচরণ করেন। পথের পাঁচালীর ব্যবসায়িক সাফল্য নিয়ে কথা বলতে গেলে যারা চেয়ার ছেড়ে উঠে যান। কিন্তু বিষয়টা অত সরল নয়। পথের পাঁচালীর মতো ব্যতিক্রমী ছবির স্রষ্টা সত্যজিৎ রায় কে বিশিষ্ট জনেরা সম্বর্ধনা দিয়েছিলেন সেনেট হলে। সেখানে বক্তারা সত্যজিৎকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন বক্সঅফিসে চিন্তা মাথায় না
রেখে পথের পাঁচালী নির্মাণ করার জন্য।সভার শেষে শেষ বক্তা হিসেবে সত্যজিৎ বলেছিলেন- বক্সঅফিস কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তিনি ছবি করেছেন এই ব্যাখ্যা তিনি নিজেই মানতে চাইছেন না। সমস্ত ফিল্মমেকারদের মতো তিনিও চেয়েছিলেন তার এই ছবিও বহুলোক দেখুক। কিন্তু বক্সঅফিস সম্পর্কে সাধারণত যে ধারণা থাকে বহু পরিচালক-প্রযোজকের, ছবির সাফল্য সম্পর্কে সে তুলনায় কিছুটা ভিন্ন ধারণা ও পথ দেখাতে চেয়েছিলেন তিনি।

জনপ্রিয়তা সম্পর্কেও তার স্পষ্ট একটি বিশ্বাসের জগত ছিল। সে বিশ্বাস অবশ্যই যুক্তিনির্ভর। সত্যজিৎ সম্পর্কে তার মতামত ছিল সত্যজিৎ রায় তার চলচ্চিত্রে তথাকথিত আর্ট এবং কমার্শিয়াল তৈরীর ক্ষেত্রে মধ্যপন্থী ছিলেন। সৌমিত্র লিখেছেন- " মধ্যপন্থী' এক অর্থে খুবই অসুন্দর শব্দ। সত্যজিৎ রায় সচেতনভাবে খানিকটা শিল্প গুণান্বিত খানিকটা দর্শকের মনোরঞ্জনের দিকে নজর দিয়ে ছবি করেছেন এমন কখনো ঘটেনি। তিনি সর্বদাই শিল্প গুণান্বিত ছবি করার চেষ্টা করেছেন। আরো পরিস্কার করে বললে তিনি সর্বদাই শিল্প গুণান্বিত সুন্দর ছবি দিয়েই দর্শকদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করে গেছেন" একথা বেশি করে সত্যি হয়ে আমাদের কাছে ধরা দেয় যখন দেখি নির্মল দে সম্পর্কে সত্যজিৎ লেখেন বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রয়োজন এই ধরনের ডিরেক্টরের। আমরা মনে করতে পারি নির্মল দে সেই পরিচালক যিনি বানিয়েছিলেন" বসু পরিবার"" সাড়ে চুয়াত্তর" এর মতো হিট ছবি বাংলা হাসির শ্রেষ্ঠ ছবিগুলির একটি' সাড়ে চুয়াত্তর'। যার চিত্রনাট্যকার ছিলেন নবান্ন খ্যাত বিজন ভট্টাচার্য।অসিত সেন রাজেন তরফদার অজয় করেরা মৃণাল তপনের পাশে মোটেও অনুজ্জ্বল নন। এদের ভালো এবং জনপ্রিয় ছবির জোগান, মৃণাল -ঋত্বিকদের ও ভাবাতো নিশ্চয়ই। নইলে প্রায় গল্প হীন সুবর্ণরেখা এর এতো খ্যাতি জোটে কি করে? মোটকথা চ্যাপলিন কিংবা হিচকক, বিলি ওয়াইল্ডার থেকে তপন সিনিহা সকলেই বানিজ্য সফল ভালো সিনেমা বানিয়েছেন।
মোটকথা পুঁজিবাজার এর একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রভাব সামগ্রিক ভাবে কালচার ইন্ডাস্ট্রির কতটা এবং
কেমন ক্ষতি করে চলেছে এটা নিশ্চিত ভাবেই ভাবতে হবে। এবং অগ্রাধিকার দিয়েই। কিন্তু পুঁজি বিরোধিতার বামাদর্শে বিশ্বাসী বলেই আমার ছবি ,আমার থিয়েটার ভালো- এই সহজ সমীকরণ কে নাকোচ করার প্রস্তাব রাখেন সৌমিত্র। এবং বাজারের অভ্যন্তরে শিল্পীর লড়াইও যে পার্থক্য তৈরি করতে পারে এই বিশ্বাস তিনি আমৃত্যু যত্ন করে রেখে দেন।




Comments