ইতিহাস ও স্মৃতির পথ দিয়ে নানা মঞ্চের সন্ধান চালালেন অমর চট্টোপাধ্যায়
- Mar 10, 2021
- 5 min read
Updated: Mar 11, 2021

অমর চট্টোপাধ্যায়
ভাড়া করা চেনা স্টেজে থিয়েটার করার সময় চিন্তা কম হয় কিন্তু বাইরে কোথাও গেলে ভাবনা আসে স্টেজটা কেমন ? মাপ ঠিক থাকবে তো ? চারটে উইং, অন্তত তিন ফুট এ্যপ্রোন থাকবে বলেছে , পাবো তো?
হরেক ভাবনা ভীড় করে।
এমন মঞ্চ যদি না-ই হয় !!
নিজের কথা বলি প্রথমে - -
"এবার যেতে হবে রে । আর খাস না।"
সারা দুপুর সবুজ ঘাসে চড়েছে একাদশী। সাথে আমি, সবুজ আম - আমলকী গাছের নীচে নীচে । মেঘের চাদরে ভেসে চলে যাই মার কাছে ।
আবার ফিরে আসি।
বিকেল হল, ফিরতে হবে পিসিমার বাড়ি । পঞ্চাশের মধ্যভাগে বিশ্বভারতীর এলাকায় এত ব্যারিকেট ছিল না।
আজ বুধরার । ক্লাস ছুটি । ভোরে উপাসনা মন্দিরে গান শুনেছি। সন্ধের সময় যাব লাইব্রেরীতে।
কিছু না কিছু হবেই । ফেরার সময় পিসিমা দেবে কিছুমিছু - ঠোঙা ভরা বাদাম ভাজা । হাতে মোড়া তেকোনা ঠোঙা । দশটির বেশি চিনে বাদাম ধরে না তাতে। শালবীথি থেকে একধাপ উঁচুতে লাইব্রেরীর বারান্দা। সঙ্গীত ভবনের দাদা দিদিরা প্রতি বুধবার কিছু না কিছু করবেই । বারান্দার সামনে শাল বীথির পরে মাঠ । তারপরে ঘন্টাঘর। এই মাঠ আর শালবীথি জুড়ে তখন বসন্ত উৎসব হত। লাইব্রেরির সামনের মাঠে আসন পেতে বসে পরতাম। পিসিমাও বসত আসন পেতে। ক্লাসে বা জলসায় সবাই আসন হাতে আসত । এভাবেই দেখে ফেলেছি গুরুদেবের প্রায় সবকটা নাটক।
এই তো গত বছর ১ লা বৈশাখে শান্তিনিকেতনে চণ্ডালিকা দেখলাম।
লাইব্রেরী মাঠে এখন একটা উঁচু বেদী তৈরী হয়েছে। চারিদিক খোলা । প্রসেনিয়ামের গন্ধ এখনও ঢোকেনি আশ্রমে । রসভঙ্গ হয়েছে কোথাও এমন তো মনে হল না।
* * * * * *
ষাটের দশকের প্রথম ভাগ ।
আমি পড়ি ক্লাস সিক্সে , বার্ণপুর মাল্টিপারপাস হাই স্কুলে যার সাথে আমার পূর্বস্মৃতি কখনোই মেলেনি।
পুজোর ছুটিতে পিসিমা আসতেন শান্তিনিকেতন থেকে সপরিবারে।
এমনি এক ছুটিতে আমার শান্তিনিকেতনের স্মৃতি হাতরে বের করলাম নাটক ' টাকডুমাডুম'। জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর লেখা।
দেবেন্দ্রনাথের দ্বিতীয় পুত্র সত্যেন্দ্রনাথের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী ছিলেন বিদুষী মহিলা। ঠাকুরবাড়ির ' বালক ' পত্রিকার প্রথম সম্পাদক জ্ঞানদানন্দিনী বাড়ির অন্দরমহলে আটকে থাকেন নি।
যাক এ অন্য প্রসঙ্গ, অন্য কোন দিন।
দাদা, দিদি ভাই বোন সবাইকে বললাম টাকডুমাডুমের কথা। পূজোয় নাটক হবে, সে কী আনন্দ ! রিহার্সাল শুরু হল। নাটকের সরঞ্জাম জোগাড় চলতে থাকল পাশাপাশি। মার থেকে আলতা, বড়দির কাছ থেকে পেলাম ফেস পাউডার আর পাতা কাজল( তখন ঘরে কাজল পাতা হ'ত)। ভূষোকালির দায়িত্ব কালিকাকার । জ্যাঠামশাই কাঠের নরুন আর বনস্পতির গোল টিন দিয়ে ঢোল বানিয়ে দেবেন। মনোহরকাকু নারকেল ঝাঁটা দিয়ে শেয়ালের লেজ বানাবে আর সবাইকে পোষাক পরিয়ে দেবে।বলা বাহুল্য যে পরিচালক আমি।
ষষ্ঠীর দিন শান্তিনিকেতন এলো বার্ণপুরে। আমাদের আরও আনন্দ, পিসেমশাই তো আমাদের বন্ধু !
সত্যি, বিশ্বভারতীর নামকরা শিক্ষক ছোটদের মাঝে অনায়াসে ছোট হয়ে যেতেন। নাটকে আলো দেবার দায়িত্ব তাঁর, সহকারী মনোহরকাকু।
নবমীতে নাটক।
সকাল থেকে সবাই ব্যস্ত,এমনি এমনি। সে এক রৈ রৈ ব্যাপার।বার্ণপুরে কোম্পানির কোয়ার্টারটা ছিল রাস্তার ধারেই। রাধানগর রোড।
রাস্তার দিকে কোয়ার্টারের সামনের বারান্দা। বড়সড়ো । এটাই মঞ্চ । রাস্তা আর বারান্দার মাঝে ১০-১২ ফুট ফাঁকা জমি-- অডিটোরিয়াম। দর্শকের অভাব কি ! একান্নবর্তী সবাই । মা,বাবা,ঠাকুমাকে ধরে বাড়িতেই তো কুড়ি জন। শেষের দিকে আমার রাসভারী বাবাও উৎসাহী হয়ে পরলেন। থিয়েটার যে তাঁরও রক্তে !
ধুতি, শাড়ি, চাদর ,ওড়নায় ঘিরে বেশ রং চঙে মঞ্চ তৈরী হয়ে গেল পিসেমশাইয়ের আশ্রমিক অভিজ্ঞতায়। সমস্যা হল আলো নিয়ে। বারান্দায় একটি মাত্র বাল্ব বাকেটে ঝুলছে তাতে যথেষ্ট আলো হচ্ছে না। বাবা বাল্ব বদলে দিলেন , পিসেমশাই আর মনোহরকাকুর হাতে দিলেন পাঁচ ব্যাটারী টর্চ। দরকারে এগুলো স্পট লাইটের কাজ করবে।
নাটক করব সবাইকে নিমন্ত্রণ করতে হবে না ! ভাই বোনেরা বেরিয়ে পরলাম বাড়ি বাড়ি। কচি কাঁচারা গেলে কোন্ পাষণ্ড মুখ ফিরিয়ে নেয় !
চরম উত্তেজনায় শুরু হয়ে গেল নাটক। আমার পেছনে প্যান্টের সাথে খেজুর পাতার ঝাঁটা বেঁধেছে মনোহরকাকু , ওটা শেয়ালের লেজ। তার ওপরে দুপাট্টা ধুতি হাঁটুর ওপর পর্যন্ত। সারা গায়ে মুখে কালো - সাদার রংবাহার। মঞ্চে কোন উইং নেই। দু পাশেই কাপড় টানা। আমরা ঢুকছি বেরিয়ে যাচ্ছি তার নীচ দিয়ে গুঁড়ি মেরে যেন শেয়াল তার গর্ত থেকে বাইরে আসছে বা কুমোর তার অন্দর থেকে দাওয়ায় আসছে। অক্লান্ত মনোহরকাকু আর পিসেমশাই পাঁচ ব্যাটারী জ্বালিয়েই রেখেছে মুখের ওপর। চলতে চলতে হঠাৎ থেমে গেল নাটক , আমার এক ভাই ' অজু ' আর চাপতে পারল না ছুটে চলে গেল দর্শকদের মাঝখান দিয়ে রাস্তায়। হাল্কা হয়ে ফিরে এলো।
উপায় না দেখে বাবা ঘোষণা করে দিলেন " এই সময়টুকুকে আপনারা বিরতি হিসেবে ধরে নিন "।
আবার শুরু হল , যথাসময়ে শেষ হল নাটক।
১১ বছর বয়সে সেই আমার প্রথম নাটক- সেই শুরু।
পুরো ছুটিটা এই আনন্দে মশগুল ছিলাম আমরা। ঠাকুমা তো বলেই ফেললেন -" মৈন্যার পোলা তো - - -"
মনি আমার বাবার ডাক নাম।
ছোট ছোট পা গুলোর তখন ওজন কত !
অপেরার আঙ্গিকে করা জ্ঞানদানন্দিনীর এই নাটক এখনও মনে পরে--
" নাকের বদলে নরুন পেলাম/ টাক ডুমাডুম ডুম/ নরুনের বদলে হাঁড়ি পেলাম/টাক ডুমাডুম ডুম/ হাঁড়ির বদলে টোপর পেলাম/ টাক ডুমাডুম ডুম / টোপরের বদলে বউ পেলাম/ টাক ডুমাডুম ডুম, টাক ডুমাডুম ডুম।"
* * * * * *
কলেজ জীবন কোলকাতায়। তখন থেকে শহরতলীর বাস। চাকরির প্রথম ১০-১২ বছর কটেছে দূরে দূরে মেসে । কিন্তু থিয়েটারকে আমি সবসময় পাশে পেয়েছি ।
শহরতলীর নোটো আমি। পয়সা কোথায় নাটকের দলে ? পকেট হাতরে পেরিয়ে এলাম তিনকুড়ি দশ।
হল ভাড়া করে থিয়েটার করা এই তো সবে। যখন যে জায়গা পেয়েছি ব্যবহার করেছি। স্কুলের বারান্দা , বন্ধ করখানার গেটের সামনেটা , রাস্তার মোড় , শ্রমিক বস্তির উঠোন অথবা সব্জির বাজার-- অসুবিধে মনে হয়নি কোথাও । যাঁরা দেখেছেন তাঁদের বোঝানো গেছে যা বলতে চাই। আর কী চাই !
নিজের থেকে বুঝেছি , চিরাচরিত মঞ্চ না পেলে থিয়েটার হবে না এই ধারণা সত্যি নয়। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে কাজটা করার জন্য একটা জায়গা দরকার সেটা দর্শকদের একই তলে হতে পারে অথবা তাদের থেকে উঁচুতে বা নীচে। ইম্ফলে থিয়েটার করেছি --যেখানে দর্শকাসন গ্যালারীর মত --অভিনয় নীচে হচ্ছে , অনেকটা অ্যম্পি থিয়েটার। কারো অসুবিধে হয়নি । আসলে প্রযোজনাকে সাজিয়ে নিতে হয় মঞ্চের মানানসই করে। চিরাচরিত মঞ্চের চিরাচরিত সজ্জা এখানে বিরম্বনা ।
*********
এতক্ষন নিজের কথা বললাম এবার পিছিয়ে যাই, বই -এর থেকে বলি ।
গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেডেব সাহেব ১৭৯৫-৯৬ তে এখনকার এজরা স্ট্রিটে তাঁর তৈরী মঞ্চে ইংরেজী নাটকের অনুবাদ করিয়ে ' কাল্পনিক সংবদল ' নামে বাংলা নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন। একেই প্রথম বাংলা মঞ্চনাটক ধরা হয়।
এর আগেও বাংলায় অভিনয় হোত ।
বাংলার গ্রামে গঞ্জে রাসলীলা, কেষ্টযাত্রা ইত্যাদি অনেক আগেই জুড়ে গেছে আমাদের বিনোদন অঙ্গনে। এ সবই অভিনয় নির্ভর ।
ষোড়শ শতকের চৈতন্যদেব শুধু ধর্মপ্রচারক ছিলেন না অনেক বেশী ছিলেন সমাজ -সংস্কারক ,একজন সুপন্ডিত। নৃত্য - গীত এবং অভিনয়েও নিপুণ ছিলেন। চৈতন্যদেবের সময়কাল ১৪৮৬ থেকে ১৫৩৪ । ষোড়শ শতকে তিনি শান্তিপুরে 'দানলীলা' অভিনয় করেন। কোন মঞ্চ নির্দিষ্ট ছিল না । অধ্যাপক মন্মথমোহন বসু লিখছেন " এই অভিনয়ে তিনি স্বয়ং শ্রীরাধিকার, অদ্বৈতাচার্য শ্রী কৃষ্ণের, নিত্যানন্দ বড়াই বুড়ির , শ্রীবাসবাদি কতিপয় সখীর, কমলাকান্তাদি কতিপয় সখার, গৌরীদাস সুবলের এবং নরহরি মধুমঙ্গলের ভূমিকা গ্রহন করেন।
ভাগিরথী তীরে অভিনয় হয়। সখীরা প্রকৃত গাভী লইয়া চরাইতে যান। নদীর ধারে একটি কদম্ববৃক্ষ ছিল, সেটিকেও অভিনয়কার্যে ব্যবহার করা হয় । দধিদুগ্ধ লুণ্ঠনাদি ব্যাপারও ঠিকমত দেখান হইয়াছিল। . . . "
(বাংলা নাটকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ)
১৮৩৫ সালে শ্যামবাজারে শ্যামসুন্দর বসুর বাগানবাড়িতে ওনার নটকের দল 'বিদ্যাসুন্দর' নাটক অভিনয় করে।
নির্দিষ্ট কোন মঞ্চ ছিল না । " তাহাতে প্রত্যেক দৃশ্য পরিবর্তনের সঙ্গে দর্শকদিগকেও স্থান পরিবর্তন করিতে হইত । বকুল বনে উপবিষ্ট সুন্দর বা মালিনীর গৃহ দেখিবার জন্য দর্শক দিগকে সতন্ত্র সতন্ত্র স্থানে যাইতে হইত। তথায় তাহাদিগের জন্য আসন প্রস্তুত থাকিত। " প্রযোজনাটি নিয়ে এই কথাগুলো শ্রী যোগীন্দ্রনাথ বসু লিখেছেন তাঁর 'মাইকেল মধুসূদনের জীবনী'তে।
আরও কাছে তাকানো যাক । বিংশ শতকে বেলজিয়ামের কবি ও নাটককার মরিস মেটারলিংক ১৯০৯ সালে সেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ্ প্রযোজনা করেন বিনা মঞ্চে। এই অভিনয় হয়েছিল তাঁর ফার্ম হউসে।
ফার্মের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছিলো দৃশ্যপট।
তাহলে দেখা যাচ্ছে প্রসেনিয়াম ছাড়াই থিয়েটার সফল হয়। বাংলার বিভিন্ন পার্বনের অনুষ্ঠান বা যাত্রা
পালা বাদ দিলেও বিনা মঞ্চে পরিকল্পিত দৃশ্যপটে অভিনয় করছি প্রায় পাঁচশ বছর এবং ধারাবাহিক ভাবে। এই নাট্যরীতির নাম হয়ত স্থান , কালে বদলে বদলে যাচ্ছে।
থিয়েটার একটা মাধ্যম এটা সবাই স্বীকার করছেন। সব মাধ্যমের মত এর ব্যবহারের পেছনেও নির্দিষ্ট দর্শন কাজ করে-- সেই সময়ের সেই থিয়েটার সে ভাবেই চলে। তাই দখলের লড়াই জারি থাকে। সচেতন থাকতে হয় থিয়েটার কর্মীকে।
Make a Donation
A/C: 40910100004585
IFSC Code:BARB0BUDGEB
Bank Name: Bank Of Baroda
Name in Bank: BHAAN





Comments