উদয়শঙ্করের নৃত্য ধারার ধারণা দিলেন - শ্রীপর্ণা ভট্টাচার্য্য
- Feb 1, 2021
- 4 min read

শ্রীপর্ণা ভট্টাচার্য্য

কল্পনার উদয় শংকর।
উদয় শঙ্কর চৌধুরী ভারতীয় শাস্ত্রীয় এবং উপজাতীয় নৃত্যের উপাদানগুলির সাথে সমন্বয় ঘটান, যা পরবর্তী কালে ভারত,ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জনপ্রিয় ঘটে। এই শিল্পীর জন্ম হয় রাজস্থানের উদয়পুরের শংকর পরিবারের জমিদার বংশে ১৯০০ সালের ৮ই ডিসেম্বর। জন্মস্থানের নামানুসারে তাঁর নাম হয় উদয়।তার বাবা পন্ডিত শ্যাম শঙ্কর ছিলেন বাংলাদেশের যশোর জেলার অধিবাসী। পন্ডিত শ্যাম শঙ্কর যখন ঝালাওয়ারের মহারাজার ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ করছিলেন তখন উদয় শঙ্করের জন্ম হয়। তার পিতা, পন্ডিত শ্যাম শঙ্কর ছিলেন শিল্পবোদ্ধা প্রাজ্ঞজন।তার কাছে নৃত্যকলা ছিল একাধারে শিল্প এবং পুজা ও উপাসনা। শিল্পী উদয় সহজাতভাবে চিত্রকলা ও নৃত্যকলার প্রতি অনুরাগী হন। ১৯১৮ সালে শিল্পী উদয়কে মুম্বাইয়ের জে জে স্কুল অব আর্টস এবং পরে গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠনো হয়। এর পর তিনি উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য লন্ডনের রয়েল কলেজ অব আর্টস্ এ যান।সেখানে তাঁর শিক্ষাগুরু ছিলেন রোদেনস্টাইন। এখানে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নানান তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করেন। সেখানেই বিখ্যাত রুশ ব্যালেরিনা অ্যানা প্যাভলভার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। তাঁর কাছ থেকে নৃত্যের নানা কৌশল শেখেন ও পরে তাঁর সাথে ‘রাধাকৃষ্ণ’ এবং ‘হিন্দু বিবাহ’ নামক দুটি অনুষ্ঠান মঞ্চস্থ করেন। এরপর তিনি কথাকলি নৃত্যের শিক্ষা শুরু করেন গুরু শংকরণ নাম্বুদি কাছে। তারপর তিনি তাঁর দল গঠন করে অ্যালিস বোনারের সহযোগিতায় ১৯৩০ সালে প্যারিসে যান, নৃত্যের সঙ্গিনী হিসাবে ছিলেন সিমকী, বিষ্ণুদাস শিরালী ও অন্যান্য শিল্পীগণ ।এঁদের নিয়ে সৃষ্টি করেন ইন্দ্র, টেম্পল ডান্স, ওয়েডিং ডান্স, স্প্রিং ডান্স, পেজেন্ট ডান্স, ও আরও অন্যান্য। ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত ইউরোপ ও আমেরিকা উদয় শঙ্কর চৌধুরীর প্রযোজনায় নৃত্যকলা মঞ্চস্থ হয়।তারপর তিনি ভারতে ফিরে এলে কলকাতার টাউন হলে তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেই সময় নৃত্যকে কেউ ভালো চোখে দেখত না তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে শান্তিনিকেতনে নৃত্যকে সম্মানের আসনে বসানোর চেষ্টা করছিলেন সেই কারণেই শিল্পী উদয় শঙ্করের কাজেও তিনি নিজে খুব খুশি হলেন এবং তাঁর পাশে থেকে তাঁর শিল্পস্বত্ত্বাকে সম্মানের আসনে বসানোর চেষ্টাও করলেন। কবি রবি ঠাকুর শিল্পী উদয়কে আমন্ত্রণ জানান তাঁর দল নিয়ে শান্তিনিকেতনে আসার। শিল্পী উদয় তাঁর আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতনে যান ও তাঁর শিল্পসত্তার নির্দশন রাখেন তাঁর নৃত্যের শৈল্পিক কলার মাধ্যমে।

মিস্টার অ্যান্ড মিসেস এল্ডহার্স্টের সহযোগিতায় ১৯৩৯ সালে উত্তরপ্রদেশের আলমোড়ায় শিল্পী উদয় শংকর চৌধুরি “উদয়শংকর ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টার” (uday shankar Indian cultural center) নামে একটি নৃত্য প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। এই প্রতিষ্ঠানে শিল্পী উদয় শংকরের গুরু শংকরণ নাম্ব্রুদি পাদ নৃত্য শিক্ষা দিতেন। এছাড়া বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যাক্তিরাও যেমন আলাউদ্দিন খাঁ, গুরু কান্ডাপ্পা পিল্লাই, আমুবি সিং, রামগোপাল, সাধনা বোস, বিষ্ণুদাস সিরলী, গোপীনাথ প্রমুখ। এঁনারা নৃত্য প্রতিষ্ঠানটি সুপ্রতিস্থিত করার জন্য নানা ভাবে সাহায্য করেছেন।

১৯৪২ সালে ৮ই মার্চ অক্ষয় কুমার নন্দীর কন্যা ও নৃত্যসঙ্গিনী অমলা নন্দীর সঙ্গে উদয় শংকর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহের পর নৃত্য প্রতিষ্ঠানেই সৃষ্টি হয় ‘শিব-পার্বতী’, ‘কিরাত অর্জুন’, পুরুষ ও প্রকৃতি, নৃত্যদন্দ র মতো নৃত্যকলা। এছাড়া সেই সময়ের সামাজিক সমস্যা নিয়ে শিল্পী উদয় শংকর সৃষ্টি করলেন ‘রিদম অব লাইফ’ এবং ‘লেবার অ্যান্ড মেশনারি’। পরে উদয় শংকর INDONESIA ও MALABAR এ গিয়ে শ্যাডো থিয়েটার দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে সৃষ্টি করেন ছায়ানৃত্য রামলীলা। ১৯৪৪ সালে এই নৃত্য প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর উদয় শংকর তাঁর জমানো সমস্ত অর্থ ও শ্রম দিয়ে তৈরি করলেন ১৯৪৮ সালে ভারতের প্রথম চলচ্চিত্র যা শুধুমাত্র বাদ্যযন্ত্রের দ্বারা অভিনিত ‘কল্পনা’ চলচ্চিত্র। সেই চলচ্চিত্রে অংশগ্রহণে স্বয়ং উদয় শংকর ও তাঁর স্ত্রী অমলা শংকর ছিলেন এবং ছিলেন তাঁর শিক্ষার্থীরা।

১৯৪২ সালে তার প্রথম সন্তান,আনন্দ শংকর জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৫৫ সালে, তার কন্যা মমতা শংকর জন্মগ্রহণ করেন।পুত্র,আনন্দ শংকর খুব অল্প বয়সে গান গাওয়ার আরম্ভ করেছিলেন এবং একজন সঙ্গীতজ্ঞ এবং সুরকার হন। অন্যদিকে, কন্যা,মমতা শংকর নৃত্য ও অভিনয় শিখে , একজন বিখ্যাত অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী হয়ে ওঠেন। ১৯৪৮ সালে উদয় লিখেছিলেন, 'কল্পনা',তারই দ্বারা নির্মিত এবং পরিচালিত, ভারতের প্রথম চলচ্চিত্র মূলত শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী প্রধান চরিত্রে। তার স্ত্রী প্রধান চরিত্রটি করেন। যদিও চলচ্চিত্রটি বক্স অফিসে ভাল না করলেও, এটি পরে অনেক সমালোচক ও চলচ্চিত্র প্রেমীদের দ্বারা স্বীকৃত এবং প্রশংসিত হয়, যা ২০০৯ সালে ডিজিটাল পুনঃস্থাপন করা হয়।

১৯৫৭ সালে ‘লর্ড বুদ্ধ’ রঙিন ছায়ানৃত্য সৃষ্টি করেন।
১৯৬৫ সালে কলকাতায় উদয়শংকর ইন্ডিয়া কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৬৬ সালে সৃষ্টি করেন ‘প্রকৃতি আনন্দ’ নৃত্যনাট্য, এই নৃত্যনাট্যে তিনি বুদ্ধের ভূমিকায় নিজেকে তুলে ধরেন সকলের সামনে।
১৯৬৮ সালে জীবনের শেষবারের মতো আমেরিকা সফরে যান এবং ২৫শে নভেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হন। এবং পরে সুস্থ হয়ে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। এরপর ১৯৭০ সালে তাঁর শেষ সৃষ্টি ‘শংকরস্কোপ’, যা রঞ্জিতমলের প্রযোজনায় তৈরি হয়েছিল। এর ঠিক ৭ বছর পর অর্থাৎ ১৯৭৭ সালের ২৬ শে সেপ্টেম্বর তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

তাঁর প্রাপ্ত বহু পুরস্কার তাঁর জীবনের শৈল্পিক সত্ত্বাকে সমৃদ্ধশালী করে তুলেছিল, সেগুলি হল-
১৯৬০ সালে, "সঙ্গীত নাটক একাডেমী পুরস্কার", তিনি 'ক্রিয়েটিভ ডানস' সৃষ্টির জন্য এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার লাভ করেন।
১৯৬২ সালে, "সঙ্গীত নাটক একাডেমী ফেলোশিপ",এটি ন্যাশনাল একাডেমী অব মিউজিক, নাচ ও ড্রামা কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ সম্মান। এই পুরস্কারটি তার জীবদ্দশায় কৃতিত্বের জন্য উদয়শঙ্করকে দেওয়া হয়।
১৯৭১ সালে, পদ্মবিভূষণ, ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার লাভ করেন।
১৯৭৫ সালে, দেসিকোটটাম পুরস্কার,বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সম্মানে সম্মানিত।
উদয়-ইয়ুথ উৎসবঃ-
১৯৮৩ সালে, উদয়ের ছোট ভাই ও কিংবদন্তী পন্ডিত রবি শংকর নতুন দিল্লিতে একটি বড় উৎসব পালন করেন যা চার দিন ধরে চলে। অনুষ্ঠানটি "উদয়-ইয়ুথ উৎসব" নামে পরিচিত এবং অনেক বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও সঙ্গীতশিল্পীকে আকর্ষণ করে। উৎসবে উদয়শঙ্করের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন এবং অর্কেস্ট্রার সঙ্গীত প্রদর্শনী হয়, যা গঠিত করেন কিংবদন্তি সেতার পন্ডিত রবি শংকর নিজে।

উদয় শংকর নৃত্য উৎসবঃ-
২০০০ সাল থেকে শুরু হয় উদয় শংকরের নৃত্য উৎসব অনুষ্ঠান।প্রত্যেক বছর ৮ই ডিসেম্বর থেকে ৮দিন ব্যাপী চলে এই অনুষ্ঠান।দেশের বিভিন্ন ধরনের নৃত্য প্রদর্শিত হয় । প্রতিভাবান ও উদিয়মান শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন এই উৎসবে।আর দর্শক হিসাবে থাকেন দেশ বিদেশের বহু নামি গুণী শিল্পীগণ ও শৈল্পিক প্রিয় মানুষজন।





Comments