একসঙ্গে বসে মেহেদি হাসান আর শচীন দেব বর্মন কি শোনা উচিত?"কথা পাড়লেন - স্নিগ্ধদেব সেনগুপ্ত
- Mar 10, 2021
- 2 min read
Updated: Mar 11, 2021
গায়কের গেরো - দ্বিতীয় পর্ব
আত্মপক্ষ: গায়ক আর শ্রোতার মধ্যে একটা পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক থাকা উচিৎ। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে। শিল্পীদের দূর আকাশের তারা মনে হচ্ছে না আর। তাদের এখন ফ্রেণ্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো যাচ্ছে। কমেন্ট বক্সে ইচ্ছে করলে কাছা খুলে নেওয়া যাচ্ছে। তাই দূরত্ব থেকে আসা সমীহটা চলে গেছে। সব মানুষ তো সমান হয় না। অনেকে অতি অভদ্র হয়। অনায়াসেই সৌজন্যের বেড়া টপকাতে পারে। এই লেখার "আমি" হচ্ছে তেমন এক অতি অভদ্র, মুখফোড় গায়ক। তার শ্রোতাদের প্রতি তেমন শ্রদ্ধাটদ্ধা নেই। সে নিজেকে নিয়ে সদা সচেতন, সিরিয়াস। মাঝেমাঝে খানিকটা আত্মপ্রচারমুখী। এই "আমি" চরিত্রটা কাল্পনিক কিনা সেটা নিশ্চিতভাবে জানতে পারলে বলে দেব। বাকি সব চরিত্রই ঘোর বাস্তব। দ্বিতীয় পর্ব আচ্ছা, শচীন তেণ্ডুলকর উইকেট কিপিং করতে পারেন কিনা, সেই নিয়ে আপনি কোনওদিন মাথা ঘামিয়েছেন? মেসির গোলকিপিং-দক্ষতা পরীক্ষা করা হয়নি বলে তাকে বিশ্বসেরা বলতে কুন্ঠিত হয়েছেন কি? কখনও কোনও চাইনিজ রেস্তোরাঁতে গিয়ে সেখানকার শেফ মুড়িঘণ্ট ভাল রাঁধেন কিনা খোঁজ নিয়েছেন? কিন্তু, গায়ক হলেই মুশকিল। আপনাকে হতে হবে "ভার্সেটাইল"। এর কোনও লক্ষ্যভেদী বাংলা নেই। একজন ভার্সেটাইল কণ্ঠশিল্পীকে "মঙ্গলদীপ জ্বেলে" দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করতে হবে। তারপরে "অ্যায়সি লাগি লগন", "আমার ভিতর বাহিরে", "পেয়ার কা পেহলা খত", "দমাদম্ মস্ত কলন্দর", "মেরা কুছ সামান", "মিলন হবে কতদিনে", "জীবনে কী পাব না", "লুঙ্গি ডান্স"... ইত্যাদি মোটামুটি দক্ষতায় গাইতে হবে। তারপর হয়তো গুছিয়ে কোমর বেঁধে "দো ঘুঁট মুঝে ভী পিলা দে" দিয়ে সমবেত মাতালমণ্ডলীকে নাচিয়ে শেষ করতে হবে। এর মধ্যে ক্লাসিকালের ওজন বইতেও যে তিনি সক্ষম, সেটা প্রমাণ করতে মাঝারি দক্ষতার তান-সরগমের ফোয়ারা ছুটিয়ে "বাজে গো বীণা" বা "লাগা চুনরি মে দাগ" বা "জোছনা করেছে আড়ি" যাবে আসবে। এক-আধবার সম-ফাঁক উলটে যাবে, কিন্তু তার জন্য কেউ "মনে কিছু লিবেন না"। বিয়েবাড়িতে লোকজনকে দূর থেকে খেতে দেখবেন কখনও মন দিয়ে। দেখবেন কেমন অনায়াসেই ঘোরতর গরমিলের খাদ্যবস্তু লোকে কিছু না ভেবেচিন্তে গিলে যাচ্ছে। কড়াইশুঁটির কচুরি ঢেকে যাচ্ছে পাতুরির কলাপাতায়। "নবরত্ন কারির" ঝোল গড়িয়ে বিরিয়ানির চালের তলায় সেঁধিয়ে যাচ্ছে। অথচ কারুর কোনও বিকার নেই। গানের অনুষ্ঠানে শ্রোতাও প্রধানত এঁরাই। নিঃসংকোচে পান্নালাল দিয়ে গুলাম আলী মেখে গিলে নেবেন। শেষপাতে হানি সিং এর চাটনিতে টাকনা দেবেন। এই চাহিদা যাঁরা পূরণ করতে পারেন, তাদেরই বলে "ভার্সেটাইল"। পৃথিবীতে এই একটিই পেশা আছে - কণ্ঠসংগীতশিল্পী - যাঁদের থেকে এমন প্রত্যাশা করা হবে। রিয়েলিটি শোতে বিচারকরা কোনওদিন বলবেন না যে ভীমসেন যোশী বা নির্মলেন্দু চৌধুরী বা দেবব্রত বিশ্বাস বা এলভিস প্রেসলি বা এম. এস. সুব্বলক্ষ্মী বা আবিদা পারভীন "ভার্সেটাইল" নন। এটা তো বলবেনই না যে, সাধারণত কেউ ভার্সেটাইল হন না। প্রত্যেকের একটা নিজের পাড়া থাকে - নিজের দাপটে বিচরণ করবার এক একটা ক্ষেত্র থাকে। তাঁরা "লতাজী" আর "রফি সাহাব"-এর উদাহরণ দেবেন। তাতে মানুষের নিয়ম আর ব্যতিক্রম গুলিয়ে যাবে। আর সবাই ভাববে "এক্সপার্ট" যখন বলছে, তখন ভার্সেটাইল না হওয়াটা নিশ্চয়ই একটা খামতি। শ্রোতারা, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জিগেস করুন আপনারা নিজেরা ভার্সেটাইল কিনা। ক'দিন একসঙ্গে বসে মেহেদী হাসান আর শচীন দেববর্মণ শুনেছেন? শোনা যায় কি? শোনা উচিৎ কি? শুনলে কার প্রতি সুবিচার হত? উত্তর সবাই জানেন। কেউ ভাবা প্র্যাকটিস করেন না বলে ওই ভার্সেটিলিটির প্রত্যাশা দানা বাঁধতে থাকে। একটু ভাবতে কী হয়! শুধুই চন্দ্রমুখী আলুর দাম পড়ল কিনা, আর ছেলে আজ টিউশনে গেল কিনা... এই ভেবেই জীবন কাটবে? ভাবনাটাকে একটু বহুগামী করুন না। একটু "ভার্সেটাইল" হন।
Make a Donation
A/C: 40910100004585
IFSC Code:BARB0BUDGEB
Bank Name: Bank Of Baroda
Name in Bank: BHAAN





Comments