"এখানে শ্রোতারা শোনে আড়ি পেতে" গায়কের গেরো"এর চতুর্থ এবং শেষ পর্বে এসে বললেন - স্নিগ্ধদেব সেনগুপ্ত
- May 9, 2021
- 2 min read
গায়কের গেরো

আত্মপক্ষ: গায়ক আর শ্রোতার মধ্যে একটা পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক থাকা উচিৎ। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে। শিল্পীদের দূর আকাশের তারা মনে হচ্ছে না আর। তাদের এখন ফ্রেণ্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো যাচ্ছে। কমেন্ট বক্সে ইচ্ছে করলে কাছা খুলে নেওয়া যাচ্ছে। তাই দূরত্ব থেকে আসা সমীহটা চলে গেছে।
সব মানুষ তো সমান হয় না। অনেকে অতি অভদ্র হয়। অনায়াসেই সৌজন্যের বেড়া টপকাতে পারে। এই লেখার "আমি" হচ্ছে তেমন এক অতি অভদ্র, মুখফোড় গায়ক। তার শ্রোতাদের প্রতি তেমন শ্রদ্ধাটদ্ধা নেই। সে নিজেকে নিয়ে সদা সচেতন, সিরিয়াস। মাঝেমাঝে খানিকটা আত্মপ্রচারমুখী। এই "আমি" চরিত্রটা কাল্পনিক কিনা সেটা নিশ্চিতভাবে জানতে পারলে বলে দেব। বাকি সব চরিত্রই ঘোর বাস্তব।
চতুর্থ পর্ব (শেষ পর্ব)

শ্রোতাদের মন যোগাতে এত কিছু! যা গাইতে একেবারেই ইচ্ছে করছে না, তা গাইতে হবে। ইচ্ছে না করলেও অকারণে হাসতে হবে। গাইব বলে ঠিক করে রাখা ভাল গান "লোকে খাবে না" বলে তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। গবেট বেচুবাবুদের কথায় গুরুত্ব দেওয়ার ভাণ করতে হবে। অল্প থেকে মাঝারি দক্ষতায় অনেকরকম গান গেয়ে নিজেকে "ভার্সেটাইল" সাজানোর নাটক করতে হবে। এই করে করে গায়করা এমন অবস্থা করে ছাড়ল, যে শ্রোতারাও বিশ্বাস করতে শুরু করল যে তারা গুরুত্বপূর্ণ।
একবার ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্সে স্বর্গীয় বিলায়েত খান সাহেবের সম্ভবত শেষ বাজনার আসর। আমি, নেহাতই স্কুলের ছাত্র, সেই আসরে উপস্থিত। ওস্তাদজী দরবারি বাজাচ্ছেন। মেজাজে উপচে পড়ছে নজরুল মঞ্চ। এমন সময় দুই সহৃদয় শ্রোতা বসার জায়গা নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে একে অন্যকে দোষারোপ করতে শুরু করলেন। শীতের রাত জাগতে হচ্ছে বলে কথা। ওঁদের পেটে সামান্য পানিও পড়েছিল হয়ত। দু'চার বাক্যের মধ্যেই উচ্চস্বরে ঝগড়া শুরু হল। উচ্চস্বর মানে একেবারে সেতারের আওয়াজ ছাপিয়ে যাওয়া উচ্চস্বর। ওস্তাদজী বাজনা থামিয়ে দিলেন। মাইক্রোফোনে বললেন - "আপ এইসা মত কিজিয়ে। আপহী কে লিয়ে তো বজানে আয়ে হ্যায়! স্টেজ পে মেরে পাস আকে ব্যায়ঠ যাইয়ে।"
ওই শব্দবন্ধটা নিয়ে এখন আমাদের আলোচনা - "আপহী কে লিয়ে..."। বিলায়েত খান সাহেব বলে কথা! তাঁর বাজনা শ্রোতাদের জন্য? তাঁর নিজের জন্য নয়? আবার, এও ঠিক যে, শ্রোতাদের জন্য হলে কি আর নিজের জন্য হতে নেই? যা নিজের, তাই তো ভরসা করে সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়। সুতরাং এই দোটানার কোনও সমাধান নেই। উপমহাদেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা সাধক শিল্পীও যখন প্রকাশ্যে শ্রোতাদের এত গুরুত্ব দিলেন, তখন শ্রোতারা নিজেদের কেউকেটা মনে করবে না কেন?
এবার এর উল্টোদিকের একটা গল্প বলি, যেটা আমি প্রথম পড়ি স্বর্গীয় কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের লেখায়। এটা পুরনো ভারতের গল্প। সম্রাট আকবরের মনে হল তাঁর সভাগায়ক তানসেন এমন গান করেন! না জানি তানসেনের গুরু কেমন গাইবেন! তিনি তানসেনকে তলব করে ওঁর গুরুর গান শুনতে চাইলেন। তানসেন বললেন - "জাঁহাপনা, এটা তো বড় দুঃসাধ্য কাজ! আমার গুরু তো কাউকে গান শোনান না। উনি নিজের গান কেবল ঈশ্বরকেই নিবেদন করেন। সে জিনিসের ভাগ অন্য কাউকে দেন না।"
এরপর আকবর কি তপোধন সংলগ্ন জঙ্গলের গাছের আড়ালে লুকিয়ে সেই গান শুনেছিলেন? আমরা একটা মুঘল মিনিয়েচার পেন্টিঙে দেখি ভিক্ষুক বেশে স্বামী হরিদাসের সামনে বসে আছেন রাজবেশে তানসেন। সম্ভবত দু'জনেই গাইছেন। আর আড়ালে দাঁড়িয়ে... হ্যাঁ, বসে নয়, দাঁড়িয়েই... শুনছেন সম্রাট আকবর।
পরম্পরা বলছে, ভারতীয় সংগীত শ্রোতার জন্য নয়। কোনও আধাত্মিক সাধনার পথ, কোনও আত্ম-উপলব্ধির রাস্তাই কখনও শ্রোতার জন্য হয় না। এখানে শ্রোতারা শোনে কেবল আড়ি পেতে। যেমন আকবর শুনছিলেন। আড়ি পেতে থাকা কানগুলোকে টাকা-পয়সা বা যশলোভে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে ফেললে গায়কের গেরোই উপস্থিত হয়। আর কিছু হয় না বোধহয়।
Make a Donation
A/C: 40910100004585
IFSC Code:BARB0BUDGEB
Bank Name: Bank Of Baroda
Name in Bank: BHAAN





Comments