গায়কের গেরো' কে চেনাতে নামলেন সঙ্গীত শিল্পী - স্নিগ্ধদেব সেনগুপ্ত
- Feb 1, 2021
- 2 min read

স্নিগ্ধদেব সেনগুপ্ত
-গায়কের গেরো-
আত্মপক্ষ: গায়ক আর শ্রোতার মধ্যে একটা পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক থাকা উচিৎ। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে। শিল্পীদের দূর আকাশের তারা মনে হচ্ছে না আর। তাদের এখন ফ্রেণ্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো যাচ্ছে। কমেন্ট বক্সে ইচ্ছে করলে কাছা খুলে নেওয়া যাচ্ছে। তাই দূরত্ব থেকে আসা সমীহটা চলে গেছে।
সব মানুষ তো সমান হয় না। অনেকে অতি অভদ্র হয়। অনায়াসেই সৌজন্যের বেড়া টপকাতে পারে। এই লেখার "আমি" হচ্ছে তেমন এক অতি অভদ্র, মুখফোড় গায়ক। তার শ্রোতাদের প্রতি তেমন শ্রদ্ধাটদ্ধা নেই। সে নিজেকে নিয়ে সদা সচেতন, সিরিয়াস। মাঝেমাঝে খানিকটা আত্মপ্রচারমুখী। এই "আমি" চরিত্রটা কাল্পনিক কিনা সেটা নিশ্চিতভাবে জানতে পারলে বলে দেব। বাকি সব চরিত্রই ঘোর বাস্তব।
*প্রথম পর্ব*
এই এক হয়েছে। শ্রোতারাই নাকি শিল্পীর ভগবান! আহা গো! ভক্ত-ভগবানের কী রেশিও!
তা গায়ক হয়েছি যখন, ভগবানের বাণী শুনতে হয়। শ্রোতাতন্ত্রে যদি গানরাজ্য চলত, তাহলে তার চেহারা কেমন হত সেটা মাঝেমাঝে দেখতে ইচ্ছে করে।
বড়োরা ছোটদের ভাল চান, আর শ্রোতারা গায়কের - এটা সবাই ধরেই নিয়েছে। কিন্তু ভাল চাইলেই যে ভাল হয় না, এটা ভুলে গেছে। ভুলে গেলেই সুবিধে, তাই ভুলে গেছে। যে ভাল চাইছে, তার ভাল মন্দ বিচার করবার মতো বিবেচনা থাকবে, এটা তো একটা পূর্বশর্ত হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। মানুষ কি সাধারণত বুদ্ধিমান, বিবেচক হয় নাকি? উল্টোটাই তো সাধারণত হয়। এবার, এরা যখন বলে দেয় গায়কের কী করা উচিৎ, তখন বিপর্যয়ের সম্ভাবনাটাই প্রবল হয়ে ওঠে।
আমাকে অনেকে বলেছেন "তোমার গান যে কী ভাল লাগে...! কিন্তু তুমি এত গম্ভীর হয়ে গান করো কেন গো! একটু হাসতে কী হয়?"
যত বলি আমার দাঁতগুলো বিচ্ছিরি, এরা নাছোড়। এক প্রবাসী আত্মীয়কে একবার বললাম - "আমি আজ বারো বছর হল বিবাহিত। এখনও হাসব?" তিনি চোখ পাকিয়ে বললেন "একদম বৌমার নামে সবসময় বদনাম দেবে না বলে দিচ্ছি।"
এত জবাবদিহি করবার থেকে গানের মাঝেমাঝে ফিক করে একটু হাসা সোজা - এই ভেবে অনেকেই হাসে, আমি জানি। কিন্তু অপাত্রে হাসিদান করব কেন? এই কি শিল্পীর প্রিন্সিপাল? আমি না একজন নীতিবাজ গায়ক! নিজেকে সবসময় সিরিয়াসলি নিয়ে থাকি। গান করবার সময় গাম্ভীর্যের মোড়কে সেই আত্মসিরিয়াসনেসটাই ঝলকে ওঠে। কাজেই নিজের ওকালতি তো একটু করতেই হয়।
আচ্ছা, কেউ কখনও লতা মঙ্গেশকরকে বা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে গান গাইতে গাইতে এক গাল হাসতে দেখেছেন? প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখটা দেখলে তো মনে হত পুতুল। যেন কোনও আবেগই প্রকাশ করতে জানেন না। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বা সুবিনয় রায় কি খুব হেসে হেসে গান করতেন? মেহদি হাসান বা জগজিৎ সিং এর মুখে আমরা গান গাওয়ার সময় গাম্ভীর্য ছাড়া অন্য কোনও অভিব্যক্তি দেখেছি কি? এখনকার শিল্পীদের কারুর নাম করলাম না। সিরিয়াস লোকেদের ডিপ্লোম্যাটিক থাকতে হয় তো। তবে আছেন অনেকেই, যাঁরা অকারণে হাসেন না। আসল কথা হল, আমরা তেমন গাইতে পারি না। পারলে আর হাসি-কান্না নিয়ে কেউ মাথা ঘামাত না।
আর কেউ কেউ আছেন, যাঁরা হাসলেও লোকে দেখে বুঝতে পারে না। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা মনে নেই? সেই যে "কান্দস ক্যান্?" এর উত্তরে - "কান্দুম ক্যান্, আমার মুখটাই ওর'ম!"...। মোক্ষম!
শুনেছি রিয়েলিটি শো-তে "গ্রুমিং"-এর সময় হেসে হেসে গাওয়ার ওপর খুব জোর দেওয়া হয়। মাইরি বলছি, গানের মধ্যে অকারণ দন্তবিকাশ দেখলে গা জ্বলে যায়।




Comments