গায়কের পবিত্র কর্তব্য কি শুধুই শ্রোতার মন যোগানো? - গায়কের গেরো"
- Mar 31, 2021
- 2 min read

আত্মপক্ষ: গায়ক আর শ্রোতার মধ্যে একটা পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক থাকা উচিৎ। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে। শিল্পীদের দূর আকাশের তারা মনে হচ্ছে না আর। তাদের এখন ফ্রেণ্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো যাচ্ছে। কমেন্ট বক্সে ইচ্ছে করলে কাছা খুলে নেওয়া যাচ্ছে। তাই দূরত্ব থেকে আসা সমীহটা চলে গেছে।
সব মানুষ তো সমান হয় না। অনেকে অতি অভদ্র হয়। অনায়াসেই সৌজন্যের বেড়া টপকাতে পারে। এই লেখার "আমি" হচ্ছে তেমন এক অতি অভদ্র, মুখফোড় গায়ক। তার শ্রোতাদের প্রতি তেমন শ্রদ্ধাটদ্ধা নেই। সে নিজেকে নিয়ে সদা সচেতন, সিরিয়াস। মাঝেমাঝে খানিকটা আত্মপ্রচারমুখী। এই "আমি" চরিত্রটা কাল্পনিক কিনা সেটা নিশ্চিতভাবে জানতে পারলে বলে দেব। বাকি সব চরিত্রই ঘোর বাস্তব।
তৃতীয় পর্ব
সমকালীন অনেক কণ্ঠশিল্পীকে নিয়ে কিঞ্চিৎ পরিহাস করে আনন্দ পান যে শ্রোতারা, তাঁদের অনেকের একটা সাধারণ বক্তব্য আছে। সেটা হল - "এদের তো নিজেদের একটাও তেমন বলার মতো গান নেই। সব তো পুরনো গান গেয়েই নাম করছে।"
ঠিকই তো। ক'টা সমকালীন ভাল বাংলা গান সম্পর্কে শ্রোতারা তেমন করে জানতে পারছেন? কতজন শিল্পী নিজের গান গেয়ে উজ্জ্বল হচ্ছেন? দূর্ভাগ্যজনক সত্যিটা হল এই যে, বেশিরভাগ সেই "নামটুকুও" করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
তা বলি, নিজের গান গেয়ে আমাকে যদি কারুর মনোযোগ পেতে হয়, তাহলে সেই লোকটারও তো আমার গানটা শোনার মতো মন থাকতে হবে, নাকি! চেনা গানের মোহ থেকে সারা জীবন বেরোতে না পারলে আর কী হবে! জলসায়, টেলিভিশনে, এফ.এম স্টেশনে, এমন কী ঘরোয়া আসরেও কিছু কায়মনোবাক্যে স্থূল শ্রোতা শুধু চেনা গান, হিট গান শুনতে চান।
আমি অবাক হয়ে যাই। মানুষ অন্য লোকের থেকে শুনে বা ছবি দেখে অচেনা জায়গায় বেড়াতে যায়; নতুন রেস্তোরাঁয় গিয়ে অচেনা খাবার খায়; অচেনা পাড়ায় ফ্ল্যাট কেনে; অচেনা রিক্সাওয়ালার সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করে; মোটামুটি অচেনা মানুষকে বিয়ে করে, এবং বিচ্ছিন্ন না হয়ে, সারা জীবন কাটিয়ে দেয়। কিন্তু অচেনা গান হলেই ফোন বের করে হোয়াটসঅ্যাপ করে, বা উঠে চা খেতে বা বাথরুম করতে যায়।
তা সত্ত্বেও গায়কের পবিত্র কর্তব্য হল শ্রোতার মন যোগানো। তাঁর যা ভাললাগে তাই শোনানো। আমার যা করতে ভাললাগবে, সেটা আমি খানিকটা ভাল করে করব। অন্তত যা করতে ভাললাগেনি তার চেয়ে তো ভাল করব বটেই। স্কুলে ইতিহাস পড়তে ভাললাগত না, ফেল করতাম। ভূগোল ভাললাগত। স্কুল থেকে ফিরে প্রথমেই ভূগোলের হোমওয়ার্ক করতাম। প্রশংসিতও হতাম। এই একটা সহজ সত্যি মানতে আমাদের খুব কষ্ট। অন্য কারুর ভাললাগা গিলে আমাকে পেট ভরাতেই হবে। আমার ভাললাগার সঙ্গে সেটা কোনওমতে মিলে গেলে আমার পিতৃপুরুষ উদ্ধার হবেন।
শ্রোতার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেখি। এই চেনা গানের মোহ আসলে চেনা সুরের নস্টালজিক টান। কারণ সাধারণত চেনা লিরিক বলে কিছু হয় না। অতি স্মরণীয় গীতিকবিতারও চার লাইনের বেশি কেউ খাতা না দেখে গাইতে পারে না। গায়করাই পারে না, শ্রোতাদের থেকে তো প্রত্যাশা করাই দুরাশা।
এখনকার একজন খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী একবার একটা সাক্ষাৎকারে আরেকজন কণ্ঠশিল্পীকে বলছিলেন একটা অভিজ্ঞতার কথা। তিনি একটা জলসায় গাইছেন। শ্রোতারা একেবারে মেতে গেছেন। খুব নাচানাচি চলছে। এমন সময় গানের মাঝে তিনি নাকি উইংসে চলে এলেন। সহযোগী যন্ত্রশিল্পীরা খুব খানিক বাজিয়ে কিছুটা সময় কাটালেন। তারপর কণ্ঠশিল্পী আবার মঞ্চে ফিরে আগে গেয়ে দেওয়া লাইন আবার গাইলেন। নাচের কিন্তু বিরাম নেই। যাঁরা নাচছেন তাঁরা কি আসলে কিছু শুনছেন?
আজকাল গান শোনা একটা আনুষঙ্গিক কাজ। গান আমরা শুনি গাড়ি চালাতে চালাতে, বা রান্না করতে করতে, বা অঙ্ক কষতে কষতে। সব ক্ষেত্রেই অন্য কাজটা বেশি মনোযোগ দাবি করছে। ফলে যা হবার তাই হয়েছে।
চেনা সুরে নতুন কথা বসিয়ে গেয়ে দিলে ক'জন খেয়াল করবে মাঝে মাঝে দেখতে ইচ্ছে করে। করেই ফেলব এটা এবার কোনও এক জলসায়।
Make a Donation
A/C: 40910100004585
IFSC Code:BARB0BUDGEB
Bank Name: Bank Of Baroda
Name in Bank: BHAAN





Comments