জ্যান্ত চরিত্রের মূর্ত প্রতীক..
- Dec 30, 2020
- 3 min read

'মছলিবাবা'। সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ আমৃত্যু করে গিয়েছেন তিনি। মিনার্ভায় থিয়েটারের মহড়াকে ভেঙে যখন কেউ তাঁর অভিনয় প্রতিভার গুণে দর্শকমনে দাগ কেটে যান, তখনই চমকে উঠি আমরা। সেই কাজটাই সুনিপুণ দক্ষতায় পর্দায় করে গিয়েছেন মনু মুখোপাধ্যায়। নায়কোচিত চেহারা না হয়েও তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমাদের চির পরিচিত সমাজের জীবন্ত চরিত্রের প্রতিনিধি। এক অর্থে পর্দায় দেখা জ্যান্ত চরিত্র। অবশেষে নব্বইয়ের কোঠায় চিরতরে বিরতি নিলেন তিনি। তাঁর প্রয়াণে বিলীন হলো বাংলা ছবির চরিত্রাভিনয়ের এক অধ্যায়। বাংলা ছবির স্বর্ণযুগের চালচিত্র গড়ে তোলা অন্যতম কারিগর তিনি। রঙ্গমঞ্চের উইংস থেকে তাঁর যাত্রা শুরু। বিশ্বরূপায় একদা প্রম্পটার থেকে মঞ্চের পাদপ্রদীপে আসেন "ক্ষুধা" নাটকের হাত ধরে। কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবর্তিত শিল্পী হিসাবে অভিনয়ের সুযোগই ঘুরিয়ে দেয় মনু মুখোপাধ্যায়ের জীবনের মোড়। তারপর শুরু উত্তোরণের যাত্রাপথ। একদা টালার বাসিন্দা অভিনয়ের নেশায় হাইকোর্টে কেরানির চাকরিতে ইতি টেনে দেন। জন্মসূত্রে সৌরেন্দ্রনাথ, আমৃত্যু নিজের ডাকনাম মনু হিসাবেই পরিচিত রয়ে গেলেন দর্শকদের কাছে। পরবর্তী সময়ে মিনার্ভায় নিয়মিত থিয়েটার করতেন তিনি। পাঁচের দশকের শেষের দিকে মনু মুখোপাধ্যায় পদার্পণ করেন চলচ্চিত্রের অঙ্গনে। ১৯৫৯ এ মৃণাল সেন পরিচালিত 'নীল আকাশের নীচে' ছবির হাত ধরেই সেলুলয়েডে শুরু হয় মনু মুখোপাধ্যায়ের পথচলা। সেই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রাভিনেতা কালী বন্দ্যোপাধ্যায় মনু মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে গিয়েছিলেন পরিচালকের কাছে। এরপর একের পর এক ছবিতে চরিত্রাভিনেতা হিসাবে নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন মনু মুখোপাধ্যায়। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানোর চরিত্র আসে সত্যজিৎ রায়ের ছবি 'জয় বাবা ফেলুনাথ' এর সৌজন্যে। যদিও তার আগেই সত্যজিতের আরেকটি ছবি 'অশনি সংকেত'-এর একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মনু মুখোপাধ্যায়। তবে তাঁর অভিনয় জীবনের অন্যতম আইকনিক চরিত্র 'জয় বাবা ফেলুনাথ'' ছবির 'মছলি'। সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ আমৃত্যু করে গিয়েছেন তিনি। মিনার্ভায় থিয়েটারের মহড়া চলাকালীন ল্যান্ডলাইনে আসে ফোন। সত্যজিৎ রায় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন। আর তারপরেটা.. ইতিহাস। ছবিতে মনু মুখোপাধ্যায় কাশীর গঙ্গার ঘাটে বসা এমনই এক ভন্ড সাধু যিনি তাঁর প্রিয় ভক্তদের একটি করে মন্ত্রপুত মাছের শল্ক দেন। আর এই চরিত্রটিকে তাঁর অভিনয় দক্ষতায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন মনু মুখোপাধ্যায়। তবে এজন্য যথেষ্ট ধৈর্য্যর পরীক্ষা দিতে হয়েছে তাঁকে। শুটিংয়ের প্রথম দিন সত্যজিতের নির্দেশ মতো দেড় ঘণ্টা ধরে মেক আপ আর্টিস্টের মেকআপ গুণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মছলিবাবা। আসলে ফেলুদারূপী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের দাড়িওয়ালা মুখের সঙ্গে মিল থাকার জন্যই চরিত্রটি করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে এর পরেও প্রচারের আলো সেভাবে তাঁর গায়ে এসে পড়েনি। কিন্তু তা নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজনও বোধ করেননি মনু মুখোপাধ্যায়। পরবর্তী সময়ে মনু মুখোপাধ্যায় আবার কাজ করেন মৃণাল সেনের 'মৃগয়া'- তে। তাঁর অভিনয় গুণে সমৃদ্ধ হয়েছে পরিচালক তরুণ মজুমদারের একাধিক ছবি। সেই তালিকায় রয়েছে 'গণদেবতা', 'ফুলেশ্বরী', 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ', 'দাদার কীর্তি','মেঘমুক্তি', 'খেলার পুতুল'। এছাড়াও প্রভাত রায়ের' প্রতিদান' ও 'শ্বেত পাথরের থালা'-র মতো ছবিতেও তাঁর অভিনয় প্রশংসিত
হয়েছে।'পাতালঘর' ছবিতে গোবিন্দ 'অপয়া' বিশ্বাসের চরিত্রে মনু মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় মনে গেঁথে
রয়েছে সিনেপ্রেমীদের। তাঁর অভিনীত ছবির তালিকায় রয়েছে, 'দামু', 'দেশ', 'অনু'। জীবনের
দ্বারপ্রান্তে এসে প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যর 'বাকিটা ব্যাক্তিগত' ও সায়ন্তন ঘোষালের 'আলিনগরের
গোলোকধাঁধা' -য় অভিনয় করেছেন দাপটের সঙ্গে। আসলে অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসায় আনন্দের
সঙ্গে পার্শ্বচরিত্র বা চরিত্রাভিনয়ে কাজ করে গিয়েছেন । বড় পর্দার পাশাপাশি ছোট পর্দাতেও বেশ
সুখের হয় রমণীর গুণে'। মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে তথাগত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত তাঁর অভিনীত শেষ সুখের হয় রমণীর গুণে'। মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে তথাগত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত তাঁর অভিনীত শেষ ছবি 'ভটভটি'। নিজের কাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আমার অভিনয় করার শখ যে পূর্ণ হয়েছে এটাই তো বড় পাওয়া।আমি অভিনেতা হতে পেরেছি।" মনু মুখোপাধ্যায় প্রসঙ্গে পরিচালক অতনু ঘোষের অভিমত, "ক্যামেরার সামনে অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্য, নিঁখুত মাত্রাজ্ঞান, দুরন্ত রসবোধ ও কাজের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা।" এগুলোই তাঁকে জায়গা করে দিয়েছে দর্শকমননে। কিন্তু স্বীকৃতি.. ২০১৫তে নামমাত্র টেলিসন্মান মঞ্চে 'লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট' পুরষ্কার। বাংলা ছবির পর্দায় অপয়া চরিত্রে অভিনয় করা মনু মুখোপাধ্যায় বাস্তবিক সত্যিকারের পয়া অভিনেতা। বড়পর্দায় থাকা পারিপার্শ্বিক সমাজের জ্যান্ত চরিত্র। সেলুলয়েডের আঙিনায় থাকা আলোর বৃত্ত।




Comments