তৃণমূল সংস্কৃতি - মইদুল ইসলাম
- Mar 31, 2021
- 4 min read

সাম্প্র শক্তি দিল্লিতে সরকার গড়েছে আর আমাদের বাংলাকে
লুটছে। আমাদের দল তিনমুল বাংলা আর বাংলায় থাকা সব
মানুষের জন্য লড়ছে দাদা। কথাগুলো শহরের এক বস্তি
অঞ্চলের তৃণমূল করা এক পার্টি কর্মীর। দিল্লিতে চাষি
ভাইয়েরা আমাদের জন্য লড়াই করতেসে আর বাংলায় দিদি
আমাদের জন্য আসে। কথাগুলো দক্ষিণ বাংলার এক খুদ্র
চাষির যিনি তৃণমূল দলটি বুথে দাঁড়িয়ে করে। এই কথাগুলো
শহরের মধ্যবিত্ত ভদ্রসমাজ বুঝবেন না। তারা উপরে
উল্লেখিত দুই তারকা পার্টিকর্মীর উচ্চারণ নিয়ে টোন-
টিটকিরি করবেন। তারা তৃণমূল স্তরের মানুষের ভাষা,
ব্যাকারন এবং বানান নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করবেন। ঠিক যেমন
একজন লড়াই করা সংগ্রামী জননেত্রীর উচ্চারণ নিয়ে তারা
হাসা-হাসি করেন। কিন্তু তাতে তৃণমূল স্তরের মানুষের কিছু
যায় আসে না। উল্টে ওই টোন-টিটকিরি এবং হাসা-হাসির ফলে
তাদের মধ্যে এক ধরণের রাগ তৈরি হয় শিক্ষিত, জটিল এবং
ভদ্র মধ্যবিত্তর উপরে। ওই তৃণমূল স্তরের মানুষ রাগ করে
যে এতদিন ভদ্র সমাজ তাদের দাবিয়ে রেখেছিল। শিক্ষা এবং
কর্মসংস্থানের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতাও কুক্ষিগত করে
রেখেছিল। এবার পালা এসেছে তাদের উচিৎ শিক্ষা দেবার।
সকলের জন্য যদি ভোট হয় তাহলে শিক্ষাগত যোগ্যতা ভোটের
জন্য কোনও মাপকাঠি হতে পারে না। তাই তারা জোট বাঁধে
স্লোগান দিয়ে ‘মা-মাটি-মানুষের’ জন্য। কথাগুলো একটি নবীন
প্রজন্মের গ্রাম্য স্কুল শিক্ষকের।
গবেষণার জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে কথা
বলতে হয়। উপরের তিন ব্যাক্তি হয় তৃণমূলের কট্টর সমর্থক
অথবা সক্রিয় কর্মী। তিন নম্বর ব্যাক্তি মধ্যবিত্ত। আরও
পরিষ্কার করে বললে সরকারি চাকরির গ্রাম্য মধ্যবিত্ত।
তৃণমূল এবং মধ্যবিত্তর সম্পর্ক জটিল। এই সম্পর্ক
১৯৮০র দশক থেকে শুরু যখন আজকের তৃণমূল নেত্রী তথা
বাংলার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ১৯৮৪ সালে যাদবপুর লোকসভা
থেকে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। বাংলায় একটি রক্ষণশীল
মধ্যবিত্ত যেমন আছে তেমন একটি প্রগতিশীল মধ্যবিত্ত
আছে। ১৯৮০র দশকে যখন তৃণমূল নেত্রী কংগ্রেস রাজনীতি
করতেন তখন থেকে রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত কংগ্রেস পার্টি কে
ভোট দিত। অন্যদিকে প্রগতিশীল মধ্যবিত্ত বামফ্রন্ট কে
ভোট দিত। যাদবপুর কেন্দ্র থেকে জেতার পর সেই সময়ের
কংগ্রেসের যুবনেত্রী এমন এক মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
ডকটরেট ডিগ্রী লাভ করার দাবি করলেন যে বিশ্ববিদ্যালয়
কখনও ছিল না। জাল ডিগ্রী লাভ করার জন্য কলকাতার একটি
ইংরেজি পত্রিকা তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। বাচ্চাবেলায়
দাদুর কাছে শুনেছিলাম কে যে ওনাকে বুদ্ধি দিয়েছিল যে বিদেশী
ডকটরেট ডিগ্রী লাভ করলে নাকি যাদবপুরের মতো আঁতেল
লোকসভা আসনে ওনার জনপ্রিয়তা বাড়বে। সেই সময়
প্রগতিশীল বাঙালি মধ্যবিত্ত খেপে লাল। এক বস্তিবাসি
বাংলা মিডিয়ামে পড়া এক মহিলা আবার জ্বাল ডিগ্রী নিয়ে
আমাদের উপরে খবরদারি করছে। এই ছিল তখনকার শিক্ষিত
বাঙালির মধ্যবিত্তর একটি অংশের মনোভাব। এলিট
প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা তখন সরকারি স্কুলে বাংলা মাধ্যম
নিয়ে পড়ার জন্য সোচ্চার।
সেই আশির দশকে বাংলা ছবির দুরবস্থা পরিষ্কার। তার মধ্যে
প্রগতিশীল মধ্যবিত্তর সবথেকে জনপ্রিয় নায়ক সৌমিত্র
চট্টোপাধ্যায় চুটিয়ে ছবি করছেন। আশির দশকে পাড়ার মোড়ে
অন্তত বার দুই খিদ্দা-কে বা তপন সিংহের ‘আতঙ্ক’ (১৯৮৬)
ছবির মাস্টার মশাই কে হলুদ ট্যাক্সি তে বসে থাকতে
দেখেছিলাম। দূর থেকে তারকা অভিনেতা কে বাচ্চাবেলায়
দেখতাম আর বড়রা বলত ‘ওই দেখ, সৌমিত্রর কীরকম ফর্শা
লাল টকটকে চেহারা।’ তারপর সেই আশির দশকে দূরদর্শনে
ছবি দেখে বুঝেছিলাম যে যিনি খিদ্দা, যিনি মাস্টার মশাই
তিনিই আবার ফেলুদা, আর তিনিই অপু। কয়েক বছর আগে এক
গুণী ইতিহাসবিদ যিনি নাটকও করেন, তাঁকে বিরক্ত হয়ে
জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘আচ্ছা ওনার কি এত টাকার দরকার যার
জন্য বাজে সিনেমা আর শেষে হনুমান চালিশার বিজ্ঞাপন
করতে হয়’? ভদ্রলোক হেসে উত্তর দিয়েছিলেন ‘তোমরা তো
তার সংসারের খবর রাখ না। টাকার প্রয়োজন আছে’। ১৯৫০
থেকে ১৯৭০এর দশক পর্যন্ত বাংলা ছায়াছবির একমেভ
দ্বিতিয়ম তারকা বলতে যখন উত্তম কুমার ঠিক সেই সময়
ইন্টেলেকচুয়াল অভিনেতা বলতে তখন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
ছাড়া আর অন্য অভিনেতার নাম মনে করা যায় না যার প্রজ্ঞা
এবং সাবলীল অভিনয় বাঙালি মনে রেখে দেবে। কারণ তিনি এক
ভিন্ন ধরনের নায়ক। কিন্তু বুদ্ধিজীবী মার্কা ও বুদ্ধিদীপ্ত
ছবি ছাড়া সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অসংখ্য পপুলার ঘরানার ছবি
করেছেন যা গ্রাম-মফফস্বলের সাধারণ মানুষ টিকিট কেটে
সিনেমা হলে দেখতে গেছেন। তিনশোর উপরে ছবি, তার সঙ্গে
চুটিয়ে নাটক এবং এক কালে একটি স্বনামধন্য পত্রিকা
সম্পাদনা করেছেন। এহেন কর্মযোগী মানুষ বাংলা আর হয়ত
পাবে না। কিন্তু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্রথমে তৃণমূলের
সঙ্গে দুরত্ব স্থাপন করেন। ২০১১ সালের নির্বাচনের পরে
তৃণমূল পরিচালিত সরকার তাঁকে এক সরকারি পুরস্কার দিতে
চায়। তিনি গ্রহণ করলেন না। পরে আবার তিনি সরকারি
পুরস্কার গ্রহণ করলেন। মৃত্যুর আগে আবার তিনি
সিপিআই(এম)-এর এক পত্রিকায় বামফ্রন্ট কে সমর্থন
করলেন। এই দোলাচল তৃণমূল দল এবং তার সংস্কৃতির সঙ্গে
একভাবে বাম মনভাবপন্ন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির
দোলাচল বলা জেতে পারে।
তৃণমূল সংস্কৃতি কে বুঝতে গেলে ১৯৮০র দশক কে আরও
গভীরভাবে বুঝতে হবে। একদিকে ১৯৮৬ সালে যখন আতঙ্ক
ছবির মাস্টারমশাই আছেন আবার অন্যদিকে ‘হোপ ৮৬’ নামক
জলশা আছে যখন জ্যোতি বাবুর সামনে কোমর দুলিয়ে নাচ
হচ্ছে আর রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত এবং প্রগতিশীল
মধ্যবিত্তদের একাংশ নাক সিটকচ্ছেন। বলছেন বাম নেতা
সুভাষ চক্রবর্তী কি সব অপসংস্কৃতি বাংলায় আমদানি
করছেন। পরবর্তী কালে সুভাষ চক্রবর্তী, শ্রীদীপ ভট্টাচার্য
এবং রুপা বাগচীর বিরুদ্ধে আবার প্রগতিশীল মধ্যবিত্ত
গালিগালাজ করছেন যে কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা-নেত্রী হয়ে
তারা কেন ধর্মস্থানে যাচ্ছেন। কিন্তু ভোটের বালাই যে বড়
বালাই। নাস্তিক সেজে আপনি ভোট চাইতে পারবেন না। তৃণমূল
স্তরের মানুষ, মধ্যবিত্ত মানুষ, উচ্চবিত্ত মানুষ সবাই ধর্ম
মানে। তাই ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জন্য হোক বা ভোট
রাজনীতির পপুলার আবেদনেই হোক ধর্মীয় পরিচিতির মোড়ক
ও ধর্মীয় সুড়সুড়ি মার্কা অভিনয় করতেই হয় আর কি! তাই
আজ যারা তৃণমূল সংস্কৃতি কে পুজা কেন্দ্রিক একটি ক্লাব
কালচার বলে ঠাট্টা করে তারা বামফ্রন্টের কিছু নেতা-নেত্রী
দের তৃণমূল সংস্কৃতির কথা কিন্তু বেমালুম ভুলে যান।
তৃতীয় বিশ্বের দেশে লুম্পেন প্রলেতারিয়াত বলে যে শ্রেণিটি
আজ ক্রমশ বাড়ছে সেখানে ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গ আর বাদ
যায় কই। কিন্তু যেটা আজ গুরুত্বপূর্ণ তা হল উন্নত দেশেও
এই শ্রেণিটি বাড়ছে চাকরির অভাবে। আরও পরিষ্কার করে
বলতে গেলে শিল্পকেন্দ্রিক কারখানা না হবার ফলে বা
শিল্পকেন্দ্রিক পুঁজিবাদ গড়ে না ওঠার ফলে। এই বিশাল
অংশের মানুষ কে আজ তৃণমূল স্তরের মানুষ বলা যায় এবং
যাদের সংস্কৃতি কে তৃণমূল সংস্কৃতি ছাড়া আর কি ভাবে
চিহ্নিত করা যায়! হেগেল এবং মার্ক্স এই শ্রেণিটি সম্পর্কে
উৎসাহী ছিলেন না। হেগেলের সমাধান ছিল যে লুম্পেন
প্রলেতারিয়াত কে নতুন কলোনিতে পাচার করে দিতে হবে।
ইউরোপে আধুনিক শিল্পকেন্দ্রিক পুঁজিবাদ কে রক্ষা করার
জন্য এই লুম্পেন প্রলেতারিয়েতের কোনও প্রয়োজন নেই।
মার্ক্সের কাছেও মূলত লুম্পেন প্রলেতারিয়াত একটি পরজীবী
শ্রেণি যা পুঁজিবাদের বিকাশের জন্য অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু
হেগেল এবং মার্ক্স অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপের
পুঁজিবাদের সময়ের কথা বলছেন। একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই
লুম্পেন প্রলেতারিয়াত ভারত তথা বাংলার রাজনীতির রন্ধ্রে
রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে। কারণ রাজনীতি ছাড়া তার অন্য উপায়
আর কি বা আছে? সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই
লুম্পেন প্রলেতালিরাত আজ ঢুকে পড়ে নিত্যদিনের রাজনীতির
ভাষা পরিবর্তন করে দিচ্ছে। ভদ্র সমাজের কাছে তা আজ
তৃণমূল সংস্কৃতি কিন্তু সেই সংস্কৃতি কে কোনও একটি বিশেষ
দলের সঙ্গে যুক্ত করলে ভুল বিশ্লেষণ হবে। ভারত তথা
বাংলার সমাজের মধ্যে এই শ্রেণি আজ ক্রমবর্ধমান। ভারত
তথা বাংলার রাজনীতির অপরাধিকরন এই শ্রেণির রাজনীতিতে
প্রত্যক্ষ যোগদান করার ফল। বড় পুঁজি এই শ্রেণি কে বাদ
দিয়ে রাজনীতির চালিকাশক্তি হতে পারে না। তাই কি তৃণমূল
সংস্কৃতি আর কি বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী সংস্কৃতি সেই
বিভেদ করার সময় আজ ভারত তথা বাংলার রাজনীতিতে
অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে এই শ্রেণিটির তীব্র রাজনৈতিক
আকাঙ্খার জন্য। রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রসঙ্গে একটি কথা
আজ নির্দ্বিধায় বলা চলে। ভাষা দূষণ চলছে, চলবে। তৃণমূল
সংস্কৃতির ভাষায় ‘আপনাদের মতো দু-চার পিস মধ্যবিত্ত
অধ্যাপক কি বলছেন তাতে রাজনীতির কারবারিদের কি বা এসে
গেল’।
Make a Donation
A/C: 40910100004585
IFSC Code:BARB0BUDGEB
Bank Name: Bank Of Baroda
Name in Bank: BHAAN





Comments