//azoaltou.com/afu.php?zoneid=3651748 //azoaltou.com/afu.php?zoneid=3683887
top of page
Search

‘তিতুমীর’, ভালোবাসায় আছো, বিপ্লবেও আছো- সোহম দাস

  • Mar 31, 2021
  • 4 min read

Updated: Apr 4, 2021



সোশ্যাল মিডিয়ার চিৎকার-ময় জড়জগতে চোখ বোলাতে বোলাতে হঠাৎ স্থির হয়ে গেল

চোখ। ডান হাতের যে বুড়ো আঙুল মোবাইল স্ক্রিনকে সচল রেখেছিল, সেই বুড়ো আঙুলও

স্থির। একটি সুদৃশ্য পোস্টার। ইঁট রঙের ব্যাকগ্রাউন্ডে এক শান্ত, প্রত্যয়ী মুখের

চিত্রণ। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ, কপালে বাঁধা লাল গামছা, মুখভর্তি কালো চাপ দাড়ি। সঙ্গে

দুটি বাক্য, উপরে ‘তিতুমীরের শপথ নাও’, নিচে ‘কৃষি আইনকে রুখে দাও’। ২৩ মার্চ

ভগৎ সিং-এর মৃত্যুদিনে বিশেষ কর্মসূচির আহ্বানের উদ্দেশ্যে এই পোস্টার। এক

বিপ্লবীর মৃত্যুদিনে এসে মিশছেন আরেক বিপ্লবী। দুটি মানুষের মৃত্যুর মধ্যে প্রায়

১০০ বছরের ব্যবধান, তাঁদের কর্মক্ষেত্র আলাদা, বিপ্লবের ধারার দিকে দেখলেও

সেখানে পার্থক্যের সূক্ষ্মতা। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী লড়াইতে শহিদ হওয়ার

প্রশ্নে কিংবা নব্য ফ্যাসিবাদ-প্রতিরোধী অবস্থানে শিক্ষণীয় লিগ্যাসির প্রশ্নে

দুজনেই অনায়াসে মিলে যান।

‘তিতুমীর’ নাটক নিয়ে লিখতে বসছি যে মুহূর্তে, ঠিক তার মুহূর্তকাল আগেই যেন

কীভাবে এ পোস্টারে চোখ পড়ে গেল আমার। আর সেজন্যেই বুঝি, আকস্মিকতার

আঘাতে এই স্থির হয়ে যাওয়ার ক্ষণ।

উৎপল দত্ত-বিরচিত জনপ্রিয় ‘অ্যাজিটপ্রপ’ নাটকটি আবার মঞ্চে ফিরছে একদল

নাট্যসাধকের হাত ধরে, এ খবর রীতিমতো আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল বছর দুই আগে।

নাটকের অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় পরে আসছি। কিন্তু, আপাতত এটা

বলে রাখা কোনও অত্যুক্তি নয় যে, ‘থিয়েটার ফর্মেশন পরিবর্তক’-এর এই প্রযোজনা

সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য এক উপস্থাপনা – একথা প্রায় সকলেই

মানবেন। এই নাটক একবার দেখলে দর্শক আবারও ঠিক ফিরে আসবেন প্রেক্ষাগৃহের

আঁধারির গর্ভে, সামনের আলোকিত মঞ্চের শিল্পোদ্যমে বিভোর হবেন, তারপর

নাটকের শেষে আপনা থেকেই দুটো হাতের তালুকে সজোরে বাজিয়ে দেবেন। সেই আওয়াজ

যেন সত্যি সত্যিই গিয়ে আঘাত করবে পৃথিবীর সমস্ত অত্যাচারী শাসকের বাস্তিল

দুর্গে – এরকম এক প্রকট বিশ্বাস দর্শকের মনে অনায়াসে জাগিয়ে তুলতে পেরেছে

‘তিতুমীর’। এমন এক আশ্চর্য শক্তিই এই নাটকের অন্যতম সাফল্য।



উপস্থাপনার ক্ষেত্রে খুব সামান্য কিছু জায়গায় কিছু ছোটোখাটো বদল ছাড়া উৎপল

দত্তের মূল টেক্সট পুরোটাই অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টার এই নাটক।

আয়োজন দেখলে সততই বোঝা যায়, সমস্ত কিছুর পিছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের ভাবনা

এবং গবেষণা। মঞ্চসজ্জার কথাই যদি ধরি। নাটক দেখতে ঢুকেই দর্শকের চোখে পড়বে মঞ্চ জুড়ে

তৈরি করা বাঁশের ভারা, মই, বাঁশের ঢাল। দর্শক আঁচ করতে পারবেন, আর কিছু পরেই

এই মঞ্চে দাপিয়ে বেড়াবে কিছু নির্ভীক নাট্যযোদ্ধা। অসাধারণ এক আলোকসজ্জা

তাদের দেবে যোগ্য সঙ্গত। কখনও সেই নাট্যযোদ্ধারা উঠে আসে ব্যালকনিতে,

প্রেক্ষাগৃহকে ভরিয়ে তোলে আলোর খেলায়। সে আঁচে স্পষ্টই এক বেপরোয়া উৎসবের

গন্ধ লেগে আছে। নাট্যবিনোদনের উৎসবের সঙ্গে সেখানে মিলে যাচ্ছে বিপ্লবের

উৎসব কিংবা প্রতিরোধের উৎসব। উপস্থাপন-শৈলীর সঙ্গে মিলে যাচ্ছে নাটকের

কাহিনিক্রম। নাটকের দৃশ্যান্তর ঘটতে থাকে, তবু কেল্লা স্থির। মঞ্চশিল্পের এটাই

এক মজা। সেখানে এই স্থবিরতা সত্ত্বেও দর্শকের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সংযোগের

পরিসর বৃহৎ। একটা বিশেষ সময়ের পরে তাই দর্শকের হয়তো মনে হতে পারে, বাঁশের

কেল্লা আসলে বুঝি ক্ষমতাহীন এক প্রতিবন্ধকতা। তার হাঁটাচলার ক্ষমতা নেই। সে

বুঝি টেনে ধরে বিপ্লবী-মানসকে। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার কাহিনি বাংলার ঘরে ঘরে

কিংবদন্তি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেই বাঁশের কেল্লার নির্মাণ-ভাবনার মধ্যেই যে লুকিয়ে

থাকা সীমাবদ্ধতা কিংবা তিতু ও তাঁর বিপ্লবী সঙ্গীদের নিয়তি, সমালোচকের দৃষ্টিতে

সেই বিশ্লেষণটুকু এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে সরাসরি।

পোশাক নির্বাচনের বিষয়েও যতটা সম্ভব নিখুঁত পারিপাট্যের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুরুব্বিদের পোশাক যেরকম

হত, সেই ধরনের সাবেকি পোশাকই ব্যবহার করেছেন অভিনেতারা। এছাড়া, সেই সময়ের

প্রচলিত চুল বা দাড়ির বাহারি স্টাইলকেও অনুসরণ করা হয়েছে অত্যন্ত সচেতনভাবে।

আবার স্থানীয় যেসব শাসক চরিত্রদের দেখা যাচ্ছে, তাদের পোশাকের ক্ষেত্রে অদ্ভুত

বৈচিত্র্য। পুঁড়ার জমিদার কৃষ্ণ রায়ের ক্ষেত্রে চেকনাই ধুতি-পাঞ্জাবি, গোবরা

গোবিন্দপুরের জমিদার রতিকান্ত রায়ের যুবক পুত্র তথা ভারপ্রাপ্ত জমিদার দেবনাথ

রায় ইংরেজ পোশাক পরে, সাহেবি কেতায় চলাফেরা করেন, সাহেবের মতো বন্দুক চালিয়ে

প্রজাদের দমিয়ে রাখতে ভালোবাসেন। আবার চুতনার জমিদার বৃদ্ধ বাহাদুর-উল-মুলক্

মনোহর রায় ভূষণ বাহাদুরের পরণে মুঘলাই পোশাক, তিনি সাহেবের কুঠিতে এলেও

নিজের শরাব ছাড়া অন্য কিছু খান না। তিন বয়সের তিন জমিদারের তিন ধরনের পোশাক

বা কেতার ব্যবহার আসলে যেন এক বদলাতে থাকা সময়কালকেই চিহ্নিত করছে।



এবার আসা যাক অভিনয়ের কথায়। দু’পক্ষের চরিত্রাভিনেতারাই মোটামুটি নির্দিষ্ট

পরিসর পেয়েছেন অভিনয়ের ক্ষেত্রে। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে যাঁরা অভিনয় করেছেন,

আলাদা করে তাঁদের সকলের নাম বলতে যাওয়া এখানে কিঞ্চিৎ অসম্ভব। অনর্থকও

বটে, কারণ সেক্ষেত্রে কয়েক সেকেন্ডে বা কয়েক মিনিটের রোল পাওয়া অভিনেতাদের

সমান-গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে কোথাও যেন খাটো করে দেওয়া হয়। নাটকটি সার্বিক

অভিনয়টিই এত প্রাণশক্তিতে ভরপুর যে, প্রত্যেক অভিনেতারই আসলে যেন সমগ্র

নাট্য-ভাস্কর্যটির এক-একটি কারুকার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।



বলা যায় ক্রফোর্ড পাইরনের কথা। সে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেসিডেন্ট জেনারেল

তিতুমীরের প্রধান শত্রু সে-ই, কিন্তু তার সঙ্গে তিতুমীরের কখনও মুখোমুখি দেখা হয়

না। পাইরন বাকপটু, সারাদিন ডুবে আছেন প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের মোহে, কিন্তু নিজের

এলাকাকে নিজের দখলে রাখতে তার চেয়ে নিষ্ঠুর আর কেউ নেই। কেমন নির্লিপ্তির

সুরে সে তার ধামাধারী জমিদার ও দারোগাকে নির্দেশ দেয় – ‘তিতুকে, তিতুর স্ত্রী

মৈমুনাকে ও তিতুর পুত্র গওহরকে ওখানেই খুন করে চলে আসবেন।’ সে যেমন

ভক্তিভরে উচ্চারণ করে বিপ্রদাসের পদ, সেই তারই মুখ দিয়ে বার হয় – ‘প্রত্যেক

নারীর মধ্যে একেকটি বেশ্যা বাস করে।’ সে সাজন গাজীর গান শোনে নিয়মিত, কিন্তু

অত্যন্ত ধূর্তের মতো সাজনকেই ব্যবহার করে তিতুমীরকে শেষ করার জন্য। শেষ

যুদ্ধের আগে তিতুমীরের তার উদ্দেশ্যে বলতে থাকে – ‘বুজুর্গ লোক, পণ্ডিত শুধু

পুরোণো কিতাব পড়ে – আর তলে তলে আস্ত একটা জাতির খাদ্য, স্বাধীনতা, ইজ্জৎ,

ইমান সব কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র করে।’ তিতুর গলা তখন চড়ে গেছে রাগে, কেঁপে উঠেছে

সুতীব্র ঘৃণায়। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মিল পাচ্ছেন বর্তমান সময়ের কোনও এক

নেতার, যিনি কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথ আওড়ান?

স্বৈরাচারীর রুদ্ধদ্বার কক্ষে মুক্তকণ্ঠকে দমিয়ে রাখতে কী ধরনের আলোচনা চলে,

পাইরনের গৃহে জমিদার ও ইংরেজদের নিয়মিত বৈঠকের যে আবহ, সেখানে অনেকটাই

সেই আভাস পাওয়া যায়। আবার তিতু যখন নিজের কর্মসূচি স্থির করছেন, সেখানে

বিপ্লববাদের নানা দ্বন্দ্ব এসে জর্জরিত করছে তাঁকে। তিনি হাজার হাজার মানুষের

বাঁচার নিঃশ্বাস, তাদের রক্ষাকর্তা এবং অভিভাবক। কিন্তু ফকির মিসকিন শাহ এসে

যখন তাঁকে তাদের সম্রাট করতে চান, তিতু ভয় পান। কারণ, দিনের শেষে তিতুও একজন

মানুষ। তিনি যতই বলুন ‘হিংস্র হয়ে ওঠো’, তাও তিনি শিশু মধুসূদনকে দেখলে নিশ্চিত

মৃত্যু-খাদের সামনে দাঁড়িয়েও মুহূর্তের জন্য ভুলে যান রক্তের কথা। বাঁশের কেল্লার

মধ্যেকার দৃশ্যগুলিতে মাঝে মাঝেই এক ছোট্টও মেয়ের ছুটতে থাকা সেই জীবনকেই

প্রমাণ করে দেয় বারবার। এর জন্য নির্দেশনার বিশেষ প্রশংসা প্রাপ্য। মিসকিন শাহ



যখন তাঁকে প্রস্তাব দেন পালিয়ে বাঁচবার, তিতু বিলাপের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি যে কাঁটার মুকুট পরতে চাননি। তাঁর গড়া যে বাঁশের কেল্লা শতাব্দীর পর শতাব্দী

ধরে পড়ে পড়ে লাথি-খাওয়া মানুষকে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে, সেই বাঁশের কেল্লা আসলে

যে তাঁকে বন্ধনে জাপটেছিল। বিপ্লবীর যে বন্ধন থাকতে নেই।

তবু তিতুমীরকে দেখলে এক অদ্ভুত মায়াভরা ভালোবাসা আসে। সে ভীরুতায় পরিপূর্ণ এক

অত্যাচারীর ঘাড় ধরে যখন বলে ‘আপনি এত বেগে পালান যে স্পষ্ট কিছুই দেখা যায় না’,

তখন তাকে ভালো লাগে। যখন সে বুকের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে বলে ওঠে ‘তবে হবে

যোদ্ধা তৈরী হবে। হাসিনাকে দেখে, গোলাম মাসুমকে দেখে, এই বৃদ্ধদের দেখে…’, ভালো

লাগে তাকে। মির নিসার আলি হয়েছিলেন হজরত আলি, সেখান থেকে তিতুমীর, মানুষের

ভরসা। এই ‘তিতুমীর’-ও হয়ে উঠল এক সুতীব্র চিৎকার, কৃষক-শ্রমজীবী মানুষের

আন্দোলনের চিৎকার, ফ্যাসিবাদী শোষণকে ছুঁড়ে ফেলার চিৎকার, আর, আমাদের

মতো যারা অনেক ভেবেও সেই নিরাপদ আশ্রয় খুঁজি, সেই ভীতু মানুষদেরও চিৎকার।





Make a Donation

A/C: 40910100004585

IFSC Code:BARB0BUDGEB

Bank Name: Bank Of Baroda

Name in Bank: BHAAN

 
 
 

Comments


Subscribe to Site

Thanks for submitting!

© 2020 Bhaan Theatre | Designed by Capturegraphics.in
bottom of page