দলা দলা ভয়কে জয় করে আসছে নতুন থিয়েটার- ইন্দুদীপা সিনহা
- Feb 1, 2021
- 3 min read
আমার কাজের মাঝে মাঝে

ইন্দুদীপা সিনহা
ফিরে যাও কেন ফিরে ফিরে যাও
প্রাক-কোভিড পূর্বজন্মকালীন সময়ে আমরা আপাত সুখে কালাতিপাত করছিলাম। রঙ্গমঞ্চ ছিল, রঙ্গমঞ্চের সাম্রাজ্যবাদ ছিল, আর আমরা জলে-স্থলে-কত ছলে মায়াজাল গাঁথছিলাম।প্রাত্যহিক অভ্যাস এমন আকণ্ঠ মিশেছিল শরীরে, আমরা সাধারণত রঙ্গমঞ্চের মায়াকাননকেই ধ্রুব বলে জানতাম। আমরা, প্রজেক্ট প্রমিথিয়ুস, 2016 সালে নির্মিত একটি সংগঠন। আমাদের নৃত্য ও নাট্য প্রযোজনা নিয়মিত মঞ্চায়ন হয়ে থাকে। এখনো পর্যন্ত আমাদের প্রযোজনাগুলি হল :
●কোড রেড (থিয়েটার অলিম্পিকে অভিনীত)
●যারা জেগে থাকে
●রং রসিয়া
● অর্ধেক জীবন
●উত্তরাধিকার
●একটি সহজ খুনের গল্প
●মেটামরফোসিস
●বাসবদত্তা
●পুনরুত্থান কাব্য

শহরকেন্দ্রিক থিয়েটার যাপনের ক্ষেত্রে যারা বিকল্প পরিসর বা স্থাননির্ভর অভিনয়ের অভ্যাস জারি রেখেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রেও কিন্তু বিষয়টি মূলত নিরীক্ষামূলকই ছিল। শহরের মধ্যে কয়েকটি কৃষ্ণকক্ষে নিয়মিত অভিনয় হয়ে চলেছিল। কিন্তু তা কখনোই মূল ধারার থিয়েটারের প্রত্যঙ্গ হিসাবে চর্চিত ছিল না। নতুন কোন পারফরম্যান্স স্পেস নির্মাণের স্বপ্ন ছিল কারোর কারোর, তা সে শহরকেন্দ্রিক হোক বা শহর বহির্ভূত। কিন্তু আমাদের এই সব স্বপ্ন-ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষারা আবৃত হয়ে ছিল প্রাত্যহিক অভ্যাসের ইট-কাঠ-পাথরে। বহমান জীবন আমাদের সেই অবকাশ দেয়নি, যাতে আমরা নিজস্ব স্বপ্ন বা ইচ্ছাযাপনের বাস্তবিকতাকে লালন করতে পারি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার নিজের একটি শহর বহির্ভূত পারফরম্যান্স স্পেসের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ছিল। বর্ধমান জেলার গ্রাম দেবীপুরে আমার পৈতৃক বাড়ি এবং বাড়ি সংলগ্ন একটি মন্দির আছে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, 1844 খ্রিস্টাব্দে নির্মিত টেরাকোটার এই মন্দিরটি বাংলার অন্যতম একটি উল্লেখযোগ্য মন্দির। 120 ফুট উচ্চতার এই লক্ষ্মীজনার্দন মন্দিরটি তার নিজস্ব ঐতিহাসিক ও পুরাতাত্ত্বিক গুরুত্বের কারণে আমাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক গর্বের বিষয়বস্তু। এই মন্দিরের অনবদ্য গঠনশৈলী, মন্দির সংলগ্ন প্রাচীন কিছু স্থাপত্য এবং লালমাটির মন্দির-প্রাঙ্গণ - চিরকালই এই স্থানকে এক অতুলনীয় আকর্ষণের কেন্দ্র হিসাবে নির্মাণ করে তুলেছে। লোকমুখে প্রচলিত গল্প কথা, টুকরো টুকরো ইতিহাস, মন্দির সংলগ্ন জমিদার বাড়ির লোকপরম্পরা একে এক আশ্চর্য রূপকথায় পর্যবসিত করেছিল। কিন্তু সেই ঘটি-না ডোবা তাল-পুকুরে মন্দির এবং আনুষঙ্গিক পরিসরের অযত্নলালিত বর্ণহীন চেহারা আমাকে দীর্ঘকাল ধরে ভাবিয়েছে। এবং ভাবনাচিন্তা আমাকে জানিয়েছে যে মানুষের নিয়মিত যাতায়াত, ইতিহাস সচেতনতা এবং শিল্পকলাচর্চাই পারে এই স্থানকে পুনরুজ্জীবিত করতে। সেই প্রচেষ্টাতেই ছোট ছোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষদের যুক্ত করে ওই জায়গায় আমরা শিল্পকলাচর্চা শুরু করি। নাচ-গান-থিয়েটার ইত্যাদির মাধ্যমে ওই অসামান্য মন্দির প্রাঙ্গণ আবার প্রাণ ফিরে পেতে লাগলো। শুধুমাত্র ধর্ম - ইতিহাস বা পুরাতত্ত্বের কারণেই নয়, শিল্পচর্চার কারণেও মন্দির প্রাঙ্গণে মানুষের যাতায়াত বাড়তে শুরু করলো। পরিত্যক্ত প্রাঙ্গণ, মৃতপ্রায় স্থাপত্য, অযত্নলালিত ইতিহাসের পরিমার্জন হতে লাগল প্রতিনিয়ত। নতুন ইতিহাস রচনার এই শৈশবেই আমাদের ব্যক্তিগত- আর্থসামাজিক- রাজনৈতিক-সামগ্রিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে দিল এক আপাতঅজানা জীবাণু।

বিরস দিন বিরল কাজ
আমাদের সমকালীন মানুষদের একটা সাধারন আক্ষেপ ছিল যে আমরা তেমন কোন বড় বিপর্যয় দেখিনি। মহামারী-মন্বন্তর-মহাযুদ্ধ ইত্যাদি ইত্যাদি। সে সাধ মিটলো। আমরা এক অনিবার্য অনির্দিষ্ট অরক্ষিত ভবিষ্যতে যাত্রা করলাম। প্রতিনিয়ত প্রাণহানির আশঙ্কার সঙ্গে লড়াই করতে করতে আমরা বদলে যেতে লাগলাম। চিরতরে। সামাজিক দূরত্ববিধি মেনে চলতে চলতে আমাদের অন্তরাত্মা সংকুচিত হয়ে যেতে লাগল, বিমর্ষ হয়ে পড়লো, আমরা এক অনিবার্য স্থবিরতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়লাম। পেশাগত ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন মৃত্যু-মিছিলের অভিজ্ঞতা আমার কারুবাসনাকে বিক্ষত করছিল প্রতিপলে। সভা-সমিতি- মিটিং-মিছিল -জমায়েত সব বন্ধ হয়ে যাবার প্রভাব আমাদের আরও দ্রুত স্থাণু করে দিল। শিল্পচর্চার মূলে এই তীব্র কুঠারাঘাত আমাদের শিল্পী হিসাবে এবং মানুষ হিসাবে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিল। বেঁচে থাকার লড়াই আমাদের শিল্পচর্চার মনকে প্রান্তিক করে দিল।

খেলা ভাঙার খেলা
তালাবন্দি সময় একদা ক্ষীণ হয়ে এলো। কিন্তু আমাদের মরচে পড়া অভ্যাস আর কিছুতেই আগের চেহারায় ফিরে যেতে পারল না। রঙ্গমঞ্চের দরজা আমাদের কাছে নানারকম ফিতের ফাঁসে আটকে থাকলো। রকমারি স্বাস্থ্যবিধির কারণে, তা সে যুক্তিসংগত হোক বা না হোক, দর্শক ও শিল্পীর মধ্যে গঠিত নব্যস্বাভাবিক যোজনদূরত্ব কোনভাবেই কমিয়ে আনা সম্ভব হলো না। দীর্ঘদিন শিল্পচর্চা বন্ধ থাকার ফলে অর্থনৈতিকভাবেও শিল্পদুনিয়া এক অপূরণীয় ক্ষতির মধ্যে কোনমতে ভেসে রইল। দীর্ঘ অনভ্যাসের ফলে মুখোমুখি বসিবার সম্পর্ক ক্ষীণ হলো। আন্তর্জালিক শিল্পচর্চার সম্ভার আড়ে বহরে বেড়ে উঠতে লাগলো আর তার সঙ্গে তাল মেলাতে মেলাতে আমরা সমষ্টিবিচ্ছিন্ন হতে লাগলাম। নব্যস্বাভাবিক বিচ্ছিন্নতায় আমাদের লক্ষ বছরের যূথজীবনের প্রতিবর্ত আহত হয়ে চলল প্রতিদিন। সামগ্রিক শিল্পযাপনের অভ্যাস দিকনির্দেশ হারাতে লাগলো ক্রমশ।

নতুন করে পাব বলে
এই আপাত অনভিপ্রেত অবকাশ কিন্তু আমাদের সেই বিরল সুযোগ দিয়েছিল, যাতে আমরা নিজেদের জীবন ও যাপনকে সামগ্রিকভাবে পুনর্মূল্যায়ন করতে পারি। আমাদের সম্মিলিত শিল্পযাপনের গতিমুখকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারি। শিল্পের লক্ষ্য যদি হয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকা, তাহলে করোনাউত্তরকালের রঙ্গমঞ্চের অবস্থান কিন্তু তার বিপ্রতীপে। শিল্পচর্চাকে মাধ্যম করে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টাই কিন্তু আমাদের প্রাণিত করে বিকল্প স্থানে পারফরম্যান্সের সুযোগ খুঁজে নিতে। করোনাকালের অবকাশে শহরে ও শহরের বাইরে বেশ কিছু নতুন জায়গা গড়ে উঠতে পারল। স্বাস্থ্যবিধি মেনে জনসমাগমের বিষয়টি কারুশিল্পীদের প্রাণিত করলো স্বল্পসংখ্যক দর্শকের মধ্যে নিজেদের কাজ উপস্থাপিত করতে। রোগভীতি বা সংক্রমণের আশঙ্কার থেকেও বড় প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে লাগলো দীর্ঘ সময় সমষ্টি জীবনে না বাঁচার অভ্যাস এবং সুরক্ষার নামে সন্দেহের বাতাবরণে নিজেদের যাপনকে জারিত করার বাধ্যতা। আমি তারে পারি না এড়াতে। মাথার মধ্যে বিপ বিপ করে চলা সেই বোধ নিয়ে শুরু হয় আমাদের জেহাদ। মারীপরবর্তী অভিযোজিত সমাজে শুরু হয় আমাদের ভিন্নতর শিল্পসংগ্রাম। অন্য ছায়াপথে।

আমরা শুনেছি ওই
এক পা এক পা করে শুরু হয়েছে আমাদের লড়াই। মানুষের কাছে শিল্পচর্চার মাধ্যমে পৌঁছানোর লড়াই। মারীপরবর্তী বিপন্ন মানুষকে শিল্পসৃষ্টির মাধ্যমে নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চারের লড়াই। যাপনের মধ্যে দিয়ে কারুকর্মীদের নতুন করে বেঁচে ওঠার লড়াই। নতুন নতুন জায়গায় নানা ছোট বড় উপস্থাপনার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রাণ ফিরে পাচ্ছে আমাদের শিল্পযাপন। সেই শিল্পান্তরে সংযোগ বাড়ছে, আদান-প্রদান বাড়ছে, দলা দলা জমে থাকা ভয়-আড়ষ্টতা-একাকিত্ব ক্রমে ক্ষীণ হচ্ছে।
কোন নূতনেরই ডাক।
মাভৈঃ। চরৈবেতি।





Comments