"নাটকের নির্মাণ হয় দর্শকের কল্পনা ও চেতনার রঙ্গমঞ্চে" লিখলেন - শরণ্য দে
- Mar 10, 2021
- 4 min read
Updated: Mar 11, 2021

শরণ্য দে
মঞ্চের উপরে এক অভিনেতা এসে দাঁড়ালো - উপরের দিকে তাকিয়ে বললো, " ওই দেখো চাঁদ " - ওই
প্রেক্ষাগৃহে বসে থাকা প্রত্যেকটি লোক সেই চাঁদ দেখতে পারবে, এবং মজার ব্যাপার হলো প্রত্যেক লোক
তাঁর নিজের মতো করে সে চাঁদ দেখবে - তাঁর নিজের কল্পনা, নিজের অভিঘাত অনুযায়ী, এবং হয়তো সেই
একি দর্শক ওই নাট্যটির অন্য আর এক শো তে অন্য আরেক রকমের চাঁদ দেখবে । মোদ্দা কথা দাঁড়ালো
নাটক মঞ্চে নির্মাণ হয়না, নির্মাণ হয় দর্শকের কল্পনা এবং চেতনার রঙ্গমঞ্চে, যেটা মঞ্চে হয় সেটা
একটা উপাদান ওই কল্পনাকে প্রজ্জলিত করবার কিন্তু ওটাই আসল নয় । এবং থিয়েটারের এটাই হলো মূল
শক্তি - রবীন্দ্রনাথের কথা ধার করে বলতে গেলে - যা আছে তা দিয়ে যা নেই সেটা সৃষ্টি করা । থিয়েটার
হলো "জীবত শিল্প " কারণ এই মুহূর্তের বেঁচে থাকা, মুহূর্তের আদান প্রদান, মুহূর্তের অভিঘাত - এ সবই
ক্ষণস্থায়ী । এটার কোনো রেকর্ডিং হয়না, সঠিক রূপে সংরক্ষন হয় শুধু দর্শকের কল্পনা এবং চেতনাতে ।
এই মূল সত্যটাই ভুলে বসেছে ভারতীয় মূল ধারার থিয়েটার । সমস্যাটার শুরু ইউরোপের Realism আর
Naturalism এর অন্ধ অনুকরণের জন্য । Ibsen যখন ন্যাচারালিস্টিক থিয়েটার লিখছেন - সেটা এক
অর্থে ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবি । Doll's House এর যে পুরুষতন্ত্রের সূক্ষ শোষণ নীতির বিরুদ্ধে
গলা তোলা - তাঁর জন্য হয়তো এই বাস্তববাদী রিপ্রেসেন্টেশনের দরকার ছিল - কিন্তু তাঁর সময় ফুরিয়ে
এসেছিলো । Brecht থেকে Brook সবাই রিয়ালিসম থেকে বেড়িয়ে এসেছে । এবং কি স্টানিসলাভস্কি, যাকে
রিয়ালিস্টিক থিয়েটার শৈলীর দিকপাল হিসেবে ধরা হয়, শেষ জীবনে রিয়ালিসম থেকে বেড়িয়ে আসে । এর
কারণ কি?কারণ হয়তো অনেক খুঁজে পাওয়া যেতে পারে - সামাজিক রাজনৈতিক - কিন্তু Art এর দৃষ্টিকোণ
থেকে দেখতে গেলে রিয়ালিসম আসলে থিয়েটারর জন্য একটি শৃঙ্খলা ছাড়া আর কিছুই নয় । রবীন্দ্রনাথ
এটিকে বলেছেন, " পাশ্চাত্য বর্বরতা " ।
সমগ্র এসিয়ার ক্লাসিকাল ও ফোক থিয়েটার যদি পর্যবেক্ষণ করা হয়, দেখা যাবে যে রিয়ালিসম কখনো
থিয়েটারের অঙ্গই ছিলোনা । ভারতীয় থিয়েটারের মূল ক্ষমতাই হলো স্বল্প সামগ্রী দিয়ে বৃহৎ ছবি আঁকা
কল্পনার চিত্রপটে । ধরা যাক এক কুড়িয়াট্টম শিল্পী যখন মহাভারতের যুদ্ধের বর্ণনা করে কিংবা একটা
পান্ডবনী শিল্পী যখন অভিমন্যুর মৃত্যুর শোক উজ্জাপন করে - মঞ্চে না থাকে রথ, না অস্ত্র, না যোদ্ধা -
শুধু থাকে এক শিল্পী এবং তাঁর অভিনয়ের ক্ষমতার জোরে তৈরী হয় ভিন্ন দৃশ্য, দৃশান্তর, ঘাত প্রতিঘাত
বিভিন্ন অনুভূতির চলচিত্র - এবং এই সব কিছুই তৈরী হয় দর্শকের কল্পনায়, দর্শকের চেতনার অন্তরালে
। Grotowtski বলেছিলেন শুধু একটি অভিনেতা ও একটি দর্শক লাগে নাট্য নির্মাণের জন্য । Grotowski
ভারতীয় উপমহাদেশের থিয়েটার থেকে নিয়েছিলেন এই মিনিমালিসমের প্রয়োজনীয়তা , কিন্তু আমরা
নিজেদের থিয়েটার প্র্যাক্টিসেই আমাদের দেশের থিয়েটারের কথা ভুলে গেছি - যা আছে তা হলো ফাঁপা
রিয়ালিমের অনুকরণ - যেই রিয়ালিসম কে ইউরোপ বর্জন করে দিয়েছে বহুকাল আগে ।
মিনিমালিসম কে আপন করাটা রাজনৈতিক ভাবেও খুব দরকারি । একটি তৃতীয় বিশ্বর নাগরিক আমরা, একটি
তৃতীয় বিশ্বর থিয়েটার শিল্পী - যে দেশে এখনো সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার চাহিদা মেটাতেও বহু লোক অপারগ ।
সেই দেশের থিয়েটারের আঙ্গিক কেমন হবে? থিয়েটারের ফর্ম কেমন হবে? আমরা কনটেন্ট নিয়ে অনেক
মাথা ঘামিয়েছি, IPTA এর পরে আমরা দেখেছি গ্রুপ থিয়েটারে কিভাবে প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার গল্প,
অপরিসীম লড়াই জায়গা করে নিয়েছে - কিন্তু ফর্ম নিয়ে মাথা ঘামাবে কে? বাদল সরকার বলেছেন
কনটেন্টই ফর্মের জন্ম দেয়, কিন্তু বাংলা থিয়েটারে তা হলো কোই? এক লক্ষ টাকার সেট ব্যবহার করে
তাঁর উপরে না খেদে পাওয়া মানুষের দূঃখের কথা বলা একই সাথে ironic এবং হাস্যকর বিলাসিতা ।
Minimalism কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের থিয়েটারের মূল ফর্ম, কারণ এই হতভাগা গরিব দেশের আদর্শ কখনো
Broadway এর বিশাল বিলাসবোহুল সেট হতে পারেনা - আমাদের দেশের আত্মা থেকে বেড়িয়ে আসা যে
minimal theatre technique এবং প্রয়োগ, সেটাই এই দেশের আদর্শ ফর্ম, এবং থিয়েটারের একমাত্র
শক্তি । রাজনীতি কখনোই শুধু কন্টেনটে সীমাবদ্ধ থাকতে পারেনা, সেটা তাহলে সেই শিল্পের ব্যর্থতা,
রাজনীতি শিল্পের কনটেন্ট এবং ফর্ম দুটোকেই প্রভাবিত করবে, সেটাই আদর্শ হওয়া উচিত । ধরা যাক
নবারুণ ভট্টাচাৰ্যর কথা । উনি কিন্তু শুধু নিজের রাজনীতি কে কন্টেনটে ব্যবহার করছেননা । ওনার
কনটেন্ট যেমন প্রচন্ড ভাবে anti elitist, একই ভাবে ফর্ম এবং ভাষা ও উপন্যাস শৈলীর bourgeoisie
complacency এবং hegemony কে সজোরে ধাক্কা মারে, এবং এখানেই শিল্প হয় উঠে প্রাসঙ্গিক এবং
গুরুত্বপূর্ণ ।
Minimalism আর একটি বড়ো কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয় দাঁড়ায় কারণ থিয়েটার নামক শিল্পটা কে না চাইতেও
ফিল্মের সাথে পাল্লা দিতে হয়, এবং যথারীতি সে পাল্লায় ব্যর্থ হয় - তাঁর একটা বড়ো কারণ হলো
রিয়ালিসমের দাসত্ব । একটি ফিল্ম যতটা রিয়ালিস্টিক হতে পারে, থিয়েটার পারেনা - মানে যদি একটি ঘর
আমি ক্যামেরাতে বন্দি করি সে যতটা রিয়েল হবে, একটি মঞ্চকে যতই TV, ফুলের টব আর জানলা দিয়ে
সাজাক - সেটা মঞ্চই থাকবে, ঘরের রিয়ালিটি তাতে থাকবে না । এটা কি থিয়েটারের লিমিটেশন? একেবারেই
না । এটা থিয়েটারের শক্তি যে সিনেমার মতো সব কিছু দেখাতে হয়না - দুটি অভিনেতা যদি দুটি কিউবে বসেও
চা এর কাপ নিয়ে কথা বলে, সেটা দর্শকের কল্পনাতে একটি ঘর হিসেবে ফুটে উঠবে । যদি realism এর
যুদ্ধে চলচিত্রের সাথে লড়তে হয়, ব্যর্থতা তো সুনিশ্চিত - এ অনেকটা যেন সচিন কে বলা ফুটবলে
মারাদোনা কে হারিয়ে দেখাও। খুব দুঃখ লাগে যখন ক একজন নাম করা পরিচালকদের সাথে কথা বলে বুঝি যে
তাড়াও থিয়েটারের ফিজিক্যাল লিমিটেশন কে আর্টের লিমিটেশন ধরছে । আসলে এই ভাবনা থিয়েটারের যে
বিস্তৃত ব্যাপকতা তাকে ক্ষুদ্র করে তলে, এর থেকে সৃষ্টি হয় হীনমনতা এবং হীনমনতা দিয়ে মহৎ শিল্প
সৃষ্টি হয়না । আমি যে কথাটা শুরুতেই বলেছি ওটা আবার বলবো - থিয়েটার তৈরী হয় দর্শকের কল্পনার
রঙ্গমঞ্চে - এই সহজ বৈজ্ঞানিক সত্যটা যদি অস্বীকার করা হয় আর কলোনীয়াল হ্যাং ওভারের জন্য
রিয়ালিসমের দাসত্ব করতে হয়, তাহলে এ শিল্পের মৃত্যু খুব শীঘ্রই ঘটবে । সিনেমা একটি objective
reality এর শিল্প ও থিয়েটার হচ্ছে subjective reality এর শিল্প । পুরোনো উদাহরণটা ঝালিয়ে নিলে বলতে
হয় - অভিনেতা মঞ্চে চাঁদ বললে দর্শক নিজের মতো করে চাঁদ টা দেখে নেয়, কিন্তু সিনেমাতে অভিনেতার
বলার পরেও একটি চাঁদের শট রাখতে হবে । এটা কিন্তু আসলে সিনেমার লিমিটেশন যে সে দর্শকের কল্পনা
ব্যবহার করতে অপারগ, এই মিডিয়ামে সেটা সম্ভব নয়। কিন্তু থিয়েটারের এখানেই ক্ষমতা কিন্তু আমরা
তা বুঝতে চাইছিনা । "সেট দেখিয়ে চমকে দেবো " এই মানুষিকতা নিয়ে কাজ করে শুধু ক্ষমতা ও টাকার
আস্ফালনই হচ্ছে, শিল্প তাতে বাঁচচে কোই?
আসলে আমাদের মুক্তি আমাদের শিকড়ে । Grotowski, Brook, থেকে Richard Schechner সবাই
minimalism এর শিক্ষা নিয়েছে সাউথ এশিয়ান থিয়েটার থেকে, কিন্তু এই Colonial hegemony আমাদের
মাটির থিয়েটার থেকে করে তুলেছে বিচ্ছিন্ন । আমি বলছিনা আধুনিক থিয়েটার হবে একটি কুড়িয়াট্টম
পারফরমেন্স কিংবা একটি গম্ভীরা - আমাদের চেতনাতো আধুনিক হতেই হবে, আধুনিক সমাজের সামাজিক
ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তো থাকতেই হবে কিন্তু মূল কথা হলো ফর্ম হতে হবে মিনিমাল। আমাদের শিকরড়ের
থিয়েটারের আঙ্গিকে যে মুক্তি আছে সেটাকে যত্নে লালন করতে হবে কারণ ওখানেই লুকিয়ে আছে
ব্যাপকতা । স্টানিসলাভস্কি কিংবা Brecht এর সাথে আমাদের রবীন্দ্রনাথের "রঙ্গমঞ্চ"প্রবন্ধটিও
বারবার করে পড়া উচিত । আমাদের শকুন্তলা করতে গেলে মঞ্চে সত্যি কারের রথ তুলে দিতে হয়না,
দুশমন্তের মৃগয়া দৃশ্যতে । এই ঐপোনিবেসিক দাসত্ব থেকে বেড়িয়ে, নতুন থিয়েটারের ভাষার অনুসন্ধান
করতেই হবে, না হলে কিন্তু একই গোলোকধাঁধাতে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয় যেতে হয় ।
Make a Donation
A/C: 40910100004585
IFSC Code:BARB0BUDGEB
Bank Name: Bank Of Baroda
Name in Bank: BHAAN





Comments