পারফর্মেন্সের ভাষাঃ ‘অল্টারনেটিভ’-এর সন্ধান
- Dec 30, 2020
- 2 min read

শ্রাবস্তী ঘোষ
ছোটবেলাতে শহরে যে থিয়েটারের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, সেখানে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা থাকতেন মঞ্চের ওপরে, তাঁদের ওপরে চলত আলোর কারুকাজ। তাঁদের উল্টোদিকে মঞ্চের নিচে চেয়ারে বসে থাকেন দর্শক। দর্শকের গায়ে মঞ্চ থেকে আলোর ছোঁয়া এসে লাগে, মূলত থাকে অন্ধকার। সেই আলো- আঁধারির মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান চলে পারফর্মার ও দর্শকের মধ্যে। একসময় স্থান পরিবর্তন হল আমার। দর্শকের অন্ধকারে ঢাকা চেয়ার ছেড়ে মঞ্চের আলো সরাসরি এসে লাগল গায়ে। মঞ্চের ওপর থেকে তুলনামূলক নিচে বসে থাকা গাঢ় অন্ধকারের নিস্তব্ধতা মোহিত করত আমাকে, সে নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু, আমার নিজের মনে হতে লাগল, এইরকম বিশাল মঞ্চ, সুন্দর আকুইস্টিক, আলো-অন্ধকারের খেলার বাইরে অন্য কোন ভাষা প্রয়োজন আমার নিজের কথা বলার জন্য। দর্শক আর পারফর্মারের মাঝের এই দেওয়ালকে ভাঙার যে কথা বারেবারে বলে এসেছেন বাখতিন থেকে গ্রটস্কি- এই প্রয়োজন আমি নিজেও খানিক অনুভব করছিলাম নিজের কাজ তৈরি করতে গিয়ে।
এইসময়েই আমার নিজের কাজ তৈরি হয়, 'লেটস নট হুইস্পার'। পারফরমেন্সের পরিভাষায় যদিও এটি 'থিয়েটার' নয়, 'পারফরমেন্স আর্ট'। পারফর্মেন্সটি ঘটে ঘরের একটি কোণায়, মাটিতে। দর্শক বসেন মাটিতেই পারফর্মারকে, মানে আমাকে ঘিরে। কোন কোন পারফর্মেন্সে দর্শককে অনুরোধ করা হয়, তাঁদের মোবাইলের আলো দিয়ে পারফর্মেন্সটি দেখতে। ঘরের মধ্যে কয়েকজন মানুষ ও আমি একসঙ্গে একটা মুহূর্ত যাপন করি- একে অপরের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দে, নিস্তব্ধতার গুঞ্জনে, জামাকাপড়ের খসখসে নড়াচড়ার মধ্যে দিয়ে। এই পুরো বিষয়টিতে বেশ কটি ঘটনা ঘটে। প্রথমত, দর্শক আর আমার মধ্যের আদানপ্রদান ঘটে সরাসরি, আলোর ব্যবহার, মধ্যেকার ব্যবধান- পারফর্মেন্সের ভাষা যে বদলে দেয়, সে কথা বলাই বাহুল্য। এক্ষেত্রে যে দর্শক আর পারফর্মারের মধ্যেকারের দূরত্ব কমে তাইই নয়, দুজন দর্শকের মধ্যেও প্রত্যক্ষ আদানপ্রদান চলে। প্রসেনিয়ামের অন্ধকারে, প্রেক্ষাগৃহের বিশালতা, আরামদায়ক চেয়ার দর্শকের মনোরঞ্জনের সঙ্গে সঙ্গে যে দর্শককে ভাবায়, সেকথা অস্বীকার করি না, তবে এক্ষেত্রে দর্শকের সরাসরি অংশগ্রহণ যে থাকে না, তা বলতেই হয়। শুধু আমার পারফর্মেন্স নয়, সার্বিকভাবে দেখতে গেলে, অল্টারনেটিভ স্পেস দর্শকের সরাসরি অংশ নেওয়ার কথা বলে। সেখানে দর্শক-অভিনেতার প্রত্যক্ষ পারস্পরিক আদানপ্রদানে পারফর্মেন্স তৈরি হয়। এক্ষেত্রে দর্শক নিজেও পারফর্মার, যাকে অগস্ত্য বোয়াল বলেন, 'স্পেক্টঅ্যাক্টর'। এককভাবে দেখার (individual viewing) সঙ্গে সঙ্গে সমবেতভাবে দেখার ( collective viewing) অভিজ্ঞতা হয় এই অলটারনেটিভ থিয়েটার স্পেসে।
একইভাবে অন্য অভিজ্ঞতা হয় পারফর্মারের ক্ষেত্রেও। 'লেটস নট হুইস্পার'-এর কথাই বলি এক্ষেত্রে। collective viewing-এর আঁচ লাগে পারফর্মারের গায়েও। অনেকগুলো চোখ সামনে থেকে একটি পারফর্মারকে দেখছে। দর্শক তখন আর পারফর্মারের কাছে অন্ধকারে ঢেকে থাকা ইলিউশান নয়। আমি, একজন পারফর্মার, একজন মেয়ে, এবং অনেকগুলো চোখের সামনে বসে আছি একটা ঘরের মধ্যে। যেখানে সামনের সকলে মিলে একসঙ্গে আমাকে দেখছে। দর্শকের দৃষ্টি তখন আমার কাছে সরাসরি এসে পৌঁছে যাচ্ছে, মাঝখানে অন্ধকার-দূরত্ব কোন কিছুর ব্যবধান নেই আর।
বাংলা থিয়েটার বা বিশ্ব থিয়েটারের ইতিহাস বলে প্রসেনিয়ামের বাইরে নতুনভাবে কথা বলার জন্য, ছক ভাঙার জন্যই বারেবারে অন্য মাধ্যমের খোঁজ হয়েছে থিয়েটারে। তাই, এরা কখনও 'থার্ড থিয়েটার', আবার কখনও 'অল্টারনেটিভ' নাম নিয়েছে। ইতিহাস বারেবারে এই দুধারার মধ্যে লড়াইয়ের কথা বলে। বাংলা থিয়েটারের ক্ষেত্রেও তাই; প্রসেনিয়াম বড়ো, অভিজাত। কিন্তু, আমার নিজের মনে হয়, দুটি অন্য ভাষা, দুটি আলাদা কথা বলার মাধ্যম, শুনতেও হয় তাই অন্যভাবে। তাই সরাসরি আমার কাছে দু'ধারার মধ্যে কোন বিরোধ নেই। আমার পারফর্মেন্সে দর্শকের উপস্থিতিতে সেইদিন, সেইসময় তৈরি হয়। সেই মুহূর্তে দর্শক যদি না চান ফোনের আলো জ্বালাতে, অবশ্যই পারফর্মেন্স ঘটবে সম্পূর্ণ অন্ধকারে। অর্থাৎ, ইংরিজির 'হায়ারআরকি' নেই এখানে পারফর্মার আর দর্শকের মধ্যে।
আমার থিয়েটারের ভাষা চারদিকের দেওয়ালবিহীন এক খোলা মাঠ। সেখানে সরাসরি দেয়া-নেয়া আছে, একসঙ্গে ভাবনা আছে। এখানে পারফর্মেন্স শুধু মনোরঞ্জন নয় তাই, পারফর্মেন্স দর্শক ও
পারফর্মারের মধ্যে জন্ম নেওয়া একটা ঘটনা, যা সেইদিনের, সেই মুহূর্তে তৈরি হয় দর্শকের সরাসরি
অংশগ্রহণের মাধ্যমে। কখনও ঘর, কখনও রাস্তা, পারকিং জোন- এইসবের মধ্যে থিয়েটারের জন্ম হয়,
নতুন ভাষার খোঁজ তাই অবিরাম চলতে থাকে।




Comments