//azoaltou.com/afu.php?zoneid=3651748 //azoaltou.com/afu.php?zoneid=3683887
top of page
Search

বিকল্প থিয়েটার বিষয়ক একটি প্রস্তাব

  • Dec 30, 2020
  • 5 min read


আমরা এখন কথায় কথায় ' থিয়েটার করি', ' থিয়েটার দেখি'- বলে থাকি যেখানে সঠিকটা ' নাট্য' একথা বলতে পারিনা তার কারণ প্রবল হাসাহাসি ও কৌতুকের ভয়ে। নাটক ও নাট্য এই দুই এক নয়। প্রথমটি সাহিত্যের এবং অপরটি তার রূপায়ণে। অর্থাৎ বাংলা ভাষায় নাট্য ও নাটকের যে প্রভেদ তা হলো মূলত প্রকাশভঙ্গি। আরো সহজ করে বলতে গেলে, ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে নাট্যের চিহ্নবিজ্ঞানী Tadeusz Kowzan তাঁর The sign in the Theatre; An Introduction to the Semiology of the Art of the Spectacle নামক বইটিতে তেরোটা উপাদানের (word, tone, Mime, Gesture, Movement, Make-up, Hairstyle, Costume,props,Decor, Lighting,Music,Sound Effects) মাধ্যমে গড়ে ওঠে নাটক থেকে নাট্য। উপরিলিখিত উপাদান গুলি উপস্থাপক ও অভিনেতার আওতায় আসার পরে লিখিত নাটকের মধ্যে না থেকে তা নাট্যে পরিণত হয়েছে। এখানে আরো একটা কথা বলা প্রয়োজন যে, ছাপাখানা আবিষ্কারের পূর্বে মধ্যযুগে মূলত মঙ্গলকাব্য বেশিরভাগ পৌঁছত মানুষের কাছে কথক ও উপস্থাপকের মারফত, লিখিত আকারে নয়। তাই অনেক সম্বোধন পদ মৌখিক সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হিসেবে পাওয়া যায়। লিখিত সাহিত্য হিসেবে তৈরি হয়নি তখনো।

ফিরে আসা যাক কাউজানের তেরোটি উপাদান সম্বন্ধে। অনেকে আবার দুটি উপাদান যুক্ত করতে চেয়েছেন এই তালিকায় -- একটা হল চিত্রক্ষেপণ বা projection, অন্যটি হল নাট্যাভিনয়ের স্থান। যাই হোক, তেরোটি উপাদানের কাজ গুলি হলো প্রাথমিকভাবে নাটকের স্থান কাল - পাত্র ঠিকমতো ফুটিয়ে তোলা এবং পোশাক রূপসজ্জায় প্রকাশ পাবে প্রয়োগকারীর দৃষ্টিভঙ্গি। অন্যদিকে, শিল্পীরা বাস্তবতার শর্তকে মেনে নাও চলতে পারেন। ধরা যাক কোনো অভিনেতা তার বাস্তবের সম্ভাব্যতাকে পুরোপুরি না মেনে, তাকে অতিক্রম করে নিজের ব্যাখ্যাও মিশিয়ে দিতে পারেন। হুবহু বাস্তবের মেনে চলা থেকে তাঁকে কোনো ক্ষণে বেরিয়ে আসতেই হয়।

অর্থাৎ যে কোনো শিল্পই বাস্তবের নকল নয় তা হলো পুনর্নির্মাণ, থিয়েটার তার অন্যথা হবে কেনো।

নাট্য ও ছবির ব্যাপারে বাস্তবকে হুবহু মেনে চলার একটা রক্ষনশীল দাবি ওঠে। তার কারণ হয়তো চোখে দেখার পৃথিবী যদি কোনোভাবে ঘেঁটে যায়, তাহলে অদীক্ষিত শিল্প উপভোক্তা বিপন্নের সামনা সামনি হন। প্রাচীন দেবদেবীদের মূর্তিতে আছে নানা ধরনের বিমূর্ততা কিন্তু ছবির কাছে তবু দীর্ঘদিন ধরে যা চোখে দেখা যায় তাকে মেনে চলার দাবি জানিয়ে আসা হয়েছে। প্রাচীন মধ্যযুগে শিল্প যে ছলের মধ্যে দিয়ে ছিল, সেখানে মূর্তি বা ছবির মধ্যে দিয়ে একটা পরিচিত ধারণাকে তুলে ধরা হত। তবে আধুনিক যুগে আধ্যাত্মিক ধারণা নেই আর। সেই কারণে ইয়োরোপীয় বাস্তবতাবাদ চোরা প্রতিক্রিয়ার ছবির কাছ থেকে অনেকে হুবহু বাস্তবতা প্রত্যাশা করে থাকেন। নাট্য সম্পর্কে Eric Bently - বিখ্যাত মন্তব্য মনে পড়বে আমাদের -- A impersonates B while C looks

on. অর্থাৎ শুধু রূপের দিক থেকে নয়, তার প্রকাশভঙ্গির দিক থেকেও তাকে অন্য মানুষ হয়ে উঠতে হবে। আর এই প্রকাশভঙ্গি যেটা সে নিজে হয়তো বাস্তবে বেঁচে থাকার তাগিদে করে উঠতে পারেনি, তাকে হয়তো করতে হচ্ছে। ধরা যাক চোর ধরা পড়লে যেমন ভাবে সাধারণ মানুষ মারতে থাকে তার মধ্যে একজন লোক এসে দু- তিন ঘা কষিয়ে দিল, ব্যক্তিগত জীবনে সে হয়তো আরশোলা মারতেও ভয় পায়। সুতরাং, নাট্য হল একটা ছলনার জগৎ, ধরে নেওয়ার জগৎ। প্রাচীন নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে ইজিপ্টের পিরামিড নাটকের কথা হোক বা গ্রিক নাটকের অন্যদিকে প্রাচীন সংস্কৃত নাট্যের কথা হুবহু দেখানোর কোনো চেষ্টাই সেখানে করা হয়নি কখনোই।



রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ' রঙ্গমঞ্চ' প্রবন্ধে বাস্তবকে ভেঙ্গে ফেলাটাই রেওয়াজ তার কথা বলেছেন।

পরবর্তীকালে যদিও তার ব্যবহার কম বেশি রয়েছে। তবুও, 'আঃ, উপরেতে উঠে এলে বায়ু যেন অনেক নির্মল লাগে, লাগে না তোমার ?' একথায় আপনি শুধু ধরে নিলেন না, বিশ্বাস করলেন চাঁদ বণিকের পালায় লখিন্দর বেহুলাকে নিয়ে ওই সা৺তালি পাহাড়ের চূড়ায় বাসরঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

নাটক অভিনয়ের ইতিহাসে এরকম বহু উদাহরণ আছে যেখানে, নাট্যের শিল্পকে বজায় রাখার জন্য কতোটা ত্যাগের মুখোমুখি হতে হয়। যেমন, শম্ভু মিত্র তাঁর বহুরূপীর তিনজন সামনে সারির অভিনেতাকে (কুমার রায়, দেবতোষ ঘোষ, শান্তি দাস) দিয়ে কোরাসের একটি অংশ ' রাজা অয়দিপাউসের' মহলা প্রায় সকাল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত বিরতিহীন রিহার্সাল করিয়েছিলেন। মনের মতো হচ্ছিল না বলে। শেষে তৃপ্তি মিত্র এসে বকেঝকে উদ্ধার করলেন তাদেরকে। এখানে প্রশ্ন কি খুঁজেছেন শম্ভু মিত্র ওই তিন লাইনের মধ্যে? উত্তরে দেবতোষ ঘোষ বলেছিলেন শম্ভুদা চাইছিলেন, ওই তিনটি লাইন শোনার সঙ্গে সঙ্গে যেন দর্শকের মনে তার সমকালীন পশ্চিমবঙ্গের ছবি ভেসে ওঠে। এই হল নাট্যের সব চাইতে জোরের জায়গাগুলি।


এবার আসা যাক নাট্য সাহিত্যের অন্য এক দিক নিয়ে, শাইলকের সাম্রাজ্যবিস্তার নামে শাহজাদ ফিরদৌসের একটা উপন্যাস আছে আমরা অনেকেই পড়েছি। সেখানে একজন ভোগ করার উপাদান পাবার জন্যে এমনকী নিজের অতীতকেও বেচে দিয়েছিল। দিনের শেষে সূর্যাস্তের সময় তার বাবা তাকে প্রশ্ন করেন, সে তো তাহলে তার বাবা মাকেও বিক্রি করে দিয়েছে। এই প্রসঙ্গ আনার কারণ হল, তরুনতর নাটকের মাথারা সুমন, কৌশিক বা ব্রাত্য বসু এনাদের মতো মানুষজন এমন কিছু কিছু মন্তব্য করছেন, যা ইতিহাসের পরম্পরা অস্বীকার করা যায়। যেমন সুমন আনন্দবাজারে এক মন্তব্য করেছিলেন যে, কাঁধে ঝোলা নিয়ে লোকাল ট্রেনে চড়ে থিয়েটার করার দিন শেষ হয়ে গেছে। অঙ্গণমঞ্চে দলগুলি , তাদের মধ্যে বাদল সরকার তার শতাব্দী ত আছেই, সেই সঙ্গে আছে পথসেনা বা আয়নার মতো বেশ কিছু দল, তাঁরা কাঁধে ঝোলা নিয়ে লোকাল ট্রেনে চড়ে নাটক করতে যান। সে ইতিহাস কি মানুষ ভুলে যেতে পারে? এছাড়া নাট্যমুখ - এর কোনো এক সংখ্যায় যাঁরা টিকিটের দাম

বাড়াতে চান না থিয়েটারে তাদেরকে কৌশিক সেন বলে দিলেন তাঁদের টিকিট বিক্রি হয়না বলেই এইসব কথা বলছেন প্রভৃতি নানা বক্তব্যে একটা গোটা নাটকের দশককে অস্বীকার করেছেন বিশিষ্ঠ এই মানুষেরা। বাংলা থিয়েটার এখন কিছু কিছু আধিপত্যের নিয়ন্ত্রণে। যার ফলে থিয়েটারের আদর্শ এবং স্বাধীনতাকে গলা টিপে মারার ষড়যন্ত তে সামিল। গ্যালিলিও কে নিয়ে লেখা তাঁর বিখ্যাত নাটকে ব্রেখট দেখিয়েছিলেন কেমন করে বলবান ক্ষমতাবানরা নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে কাজে লাগায় ভয় দেখিয়ে, লোভ দেখিয়ে মানুষকে বশ করাতে। এরকম নানান কুরুচিকর মন্তব্য বাংলার নাটকের কিছু বিশিষ্টজনেরা করে থাকেন।


থিয়েটারের উত্তরসূরি হিসেবে গণনাট্য থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল পরে তা ছয়ের দশকে আমেরিকা বা ইংল্যান্ডে স্থাপিত দ্য গ্রুপ থিয়েটারের আদলে গ্রুপ থিয়েটার নামে চাতার তলায় সমবেত হল। গণনাট্যের প্রত্যক্ষ রাজনীতিমুখিতা থেকে শিল্পীদের মনে অতৃপ্ত তৈরি হচ্ছিল, আরও নানা ধরনের সমস্যা ছিল। পরে মূল আদর্শবাদী এই মানুষগুলি রাজনৈতিক ভাবে সংগঠন থেকে বেরিয়ে আসলেও সামাজিক দায়িত্ববোধ জায়গা থেকে নিজেদের সরিয়ে আনলেন না। কারণ বাদল বাবু, বিজন বাবু এবং উৎপল দত্তের ভাবনা চিন্তার জগৎ একেবারে আলাদা।পৃথক হওয়ার সত্ত্বেও দর্শকরা এই আদর্শমুখিতা শ্রদ্ধা করতেন, ভিড় করে আসতেন বিশ্বাস নিয়ে।

অন্যদিকে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল থিয়েটারে । যেমন, কাগজের বিজ্ঞাপন, প্রেক্ষাগৃহে ভাড়া

প্রভৃতিতে। কিছু উদাহরণ দিলে তা স্পষ্ট হবে, ধরা যাক অ্যাকাডেমি অভ ফাইন আর্টসে একটা চালু

প্রযোজনার অভিনয় করতে এখন কমপক্ষে পেক্ষাগৃহ ভাড়া লাগে ১৩,৫০০ টাকা, বিজ্ঞাপন(আনন্দবাজার) ৩ সেমি একটি ৪৫০০ টাকা, আবহ যিনি বাজাবেন তাঁর পারিশ্রমিক ১২০০ টাকা, আলোকসম্পাতকারীর

পারিশ্রমিক ৩০০০ টাকা, রূপসজ্জাকর ১০০০ টাকা, মঞ্চসজ্জার জিনিসপত্র গুদাম থেকে আমার খরচ গাড়ি ভাড়া ২৫০০ টাকা( দূরত্ব অনুযায়ী), চা জলখাবার (সদস্য সংখ্যার উপর নির্ভর করে, তিরিশ জনের দল হলে) ১৫০০ টাকা। মোট ২৭,০০০ টাকা। দুই প্রহরের প্রমোদে এই টাকার সংখ্যা উড়ে যায়। এই বড়ো অঙ্কের টাকা খুব সাধারণত বেশি দলের ক্ষমতায় বর্তায় না। যার টাকা বেশি, অথবা মাসল পাওয়ার তার ক্ষমতাও বেশি সবার ক্ষমতা একই স্তরের নয় এটাই স্বাভাবিক। থিয়েটারের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলো, নাট্যকর্মীরা পরিবর্তনের জন্য লড়ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের সরকার বদলের পর জহর সরকার নাটকের দলগুলি অনুদান পেতে সাহায্য করেছিলেন। তারাই সাহায্য পেলেন যারা কাছের লোক হতে পেরেছিলেন। কোন দেবতাকে তুষ্ট করতে

পারা যায় তার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছিল। ন্যায় নীতি আদর্শ এখন তলানিতে ঠেকেছে কেউ মাথা ঘামায় না।

গুটিকয়েক মহাশক্তিধর অভিনয়শিল্পী ছাড়া তার বাইরে যাঁরা এই গতেই থিয়েটার করে যাচ্ছেন তাদের অবস্থা কী? অল্পস্বল্প অনুদানের টাকা আছে হয়তো, আর আছে সুমন বাবু, ব্রাত্য বাবু, দেবেশ বাবুর মতো নাটক করার ইচ্ছে, তাঁদের নাটক দেখতে দর্শক ভিড় করে না। খরচসাপেক্ষ থিয়েটারে বিপরীতে অন্য ধরনের নাটক করার কথা বলেছেন কেউ কেউ। সাতের দশকে বাদল সরকার বেশি গুরুত্ব পেয়েছেন। কিন্তু, যে দেশে এখনও পর্যন্ত থিয়েটারকে প্রসেনিয়মকেই বোঝেন, সেক্ষেত্রে কোথাও গিয়ে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। প্রেক্ষাগৃহ আলোকসজ্জা থিয়েটারে শেষ কথা নয় একথা জানা দরকার। বাদল সরকার যেভাবে থিয়েটারকে বিকল্প পথের দিশা দেখিয়েছিলেন, তা অস্বীকার করা যাবে না। সর্বোপরি বলা দরকার, ঠান্ডা ঘরে দুশো পাঁচশো টাকা দিয়ে টিকিট কেটে অ্যাকাডেমি ইত্যাদি জায়গায় যারা যেতে পারেন না, তাঁদের কথা ভেবে থিয়েটার করার উদ্যোগ নিয়ে চলেছেন অনেকে। যে কোনো খোলা জায়গায় হতে পারবে অভিনয় ক্ষেত্র, সামান্য কিছু পয়সা দিয়ে, বা যাদের যা মনে হবে সেরকম টাকা দিয়ে যাবেন অভিনয় শেষে। এবং আলো বাড়ানো কমানোর দরকার নেই, দর্শক ঠিক বুঝে নিতে পারেন কখন দৃশ্য শেষ হল। মনে রাখা দরকার অ্যাকাডেমি, রবীন্দ্র সদন ইত্যাদি এলাকার বাইরে একটা বড়ো দেশ আছে, সেখানকার মানুষের মনে থিয়েটার সম্পর্কে চাহিদাও আছে। সমাজের নানা কাজে লাগতে পারে এই নাট্য। অন্তর্মুখ যেমন পরিকল্পনা করেছে, স্কুলে যে যে বিষয়ে পড়ানো হয় সেই নিয়ে নাটক তৈরি করা হবে।স্কুলে তাঁদের ছাত্র ছাত্রীদের সামনে অভিনয় হবে। কলকাতার বাইরে, গ্রামের দিকে অভিনয় শেখার প্রবল চাহিদা আছে। নাট্য শুধু বিনোদনের, পয়সা ওয়ালা মানুষদের জন্য না হয়ে সমাজের সমস্ত স্তরের মানুষের জন্যে হয়ে উঠতে হবে সদর্থক এক হাতিয়ার। অন্ধকারের মধ্যেও ক্ষীণ এক আলো দেখা যাচ্ছে। সেই পথের দিশারী আমরা।

 
 
 

Comments


Subscribe to Site

Thanks for submitting!

© 2020 Bhaan Theatre | Designed by Capturegraphics.in
bottom of page