মাধবী মুখোপাধ্যায় : এক নক্ষত্রের কথা
- Mar 10, 2021
- 4 min read
Updated: Mar 11, 2021

সোমনাথ লাহা
মাধবী কানন মনের আনন্দে দোলনায় দোল খেতে খেতে 'ফুলে ফুলে ভরে ঢলে' গাইছেন নায়িকা। বাংলা সিনেমার এই আইকনিক দৃশ্যটি আজও সিনেপ্রেমী দর্শকদের মনের মণিকোঠায় সমানভাবে উজ্জ্বল। আর সেই নায়িকা… তিনি স্বর্ণযুগের বাংলা ছবির এক অন্যতম নক্ষত্র। এতক্ষণ অবধি পড়ে পাঠকরা সহজেই বুঝতে পেরেছেন কার কথা বলা হচ্ছে। ঠিকই ধরেছেন। তিনি বাংলা ছবির 'চারুলতা' মাধবী মুখোপাধ্যায়। তবে বাস্তবে এই 'চারু'-র চলার পথটা মসৃণ ছিল না। ছিল সংগ্রামের। আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পাঠ তাঁকে নিতে হয়েছিল ছোটবেলা থেকেই। ১৯৪২ এর ১০ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় জন্ম মাধবী মুখোপাধ্যায়ের। বাবা শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও মা লীলাদেবীর দ্বিতীয় সন্তান তিনি।প্রথম সন্তান কন্যা হওয়ায় তাঁর মা চেয়েছিলেন পুত্র সন্তান। তাই ছোট থেকেই মাধবীকে পড়ানো হতো ছেলেদের পোশাক। ছোটমাসি তাঁর নাম দিয়েছিল টুকটুক। দাদু ডাকতেন টুকানবাবু বলে। ছোটবেলা তাঁর কেটেছে ঢাকুরিয়ার ভাড়াবাড়িতে। তারপর একটু বড় হতেই বদলাতে হলো ঠিকানা। মুসলিম মহল্লা রাজাবাজারে বাবা-মা, দিদি মঞ্জরীর সঙ্গে থাকতে শুরু করা। তবে তারপর দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে সংসার ভাগও হয়ে গিয়েছিল তাদের। বাবা -মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ দেখতে হয়েছে তাঁকে। এরপর এ বাড়ি ও বাড়ি, এ পাড়া সে পাড়ায় কষ্টের দিন গুজরান। সংসারে আয় বলতে ছিল লীলাদেবীর গানের টিউশন। তারপর দেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর আর্থিক অনটনের সংসারের হাল ধরতে মা লীলাদেবীর হাত ধরে পাঁচ বছরের মাধুরী( তখনও তিনি মাধবী হননি) পা রাখল প্রফেশনাল থিয়েটারের মঞ্চে। শ্রীরঙ্গমে নাট্যগুরু শিশির ভাদুড়ির কাছে আত্মনির্ভর হওয়ার শিক্ষা পেল ছোট মাধুরী। যোগেশ চৌধুরীর নাটক 'সীতা'-র হাত ধরেই তাঁর মঞ্চাভিনয়ের শুরু। সেখানই পাওয়া সরযূবালাদেবী, প্রভাদেবীর সান্নিধ্য। তারপর প্রভাদেবী তাকে নিয়ে যান মিনার্ভায়। সেখানে ছবি বিশ্বাসের পরিচালনায় 'ধাত্রী-পান্না' নাটকে পান্নার ছেলে কনকের চরিত্রে অভিনয়। ছোট মাধুরীর মাসিক ২৫টাকা বেতনে সেই কাজের শুরু। এরপর নরেশ মিত্রর পরিচালনায় 'আত্মদান' নাটকে অভিনয়। ভারতীয় দর্শনের উপর ভিত্তি করে তৈরি সেই নাটকে 'মাৎসর্য' ও 'বৈরাগ্য' এই দুই চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। বিবেকের চরিত্রে অভিনয় করতেন 'কিন্নরকন্ঠী' সীতাদেবী। 'লোভ' করতেন শ্যাম লাহা এবং 'জ্ঞান' এর ভূমিকায় কৃষ্ণ চন্দ্র দে। বলা বাহুল্য এই নাটকে অভিনয় করার সুবাদে কৃষ্ণ চন্দ্র দে-র কাছে গান শেখার হাতেখড়ি হয় ছোট্ট মাধুরীর। এরপর ছোট্ট মাধুরীর শিশু শিল্পী হিসাবে চলচ্চিত্রে অভিনয়ে পদার্পণ। শ্যাম লাহা তাঁকে নিয়ে যান সাহিত্যিক-পরিচালক প্রেমেন্দ্র মিত্রর কাছে। প্রেমেন্দ্র মিত্রের পরিচালনায় 'কাঁকনতলা লাইট রেলওয়ে' ছবির হাত ধরে সেলুলয়েডে কাজ শুরু তাঁর। তারপর প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'দুই বেয়াই', 'সেতু' ছবিতে অভিনয়। পুরোদস্তুর নায়িকা হিসেবে কাজ শুরু করেন তপন সিংহর ছবি 'টনসিল' থেকে। এরপর মাধুরীর অভিনয় জীবনে আসে বাঁক। পরিচালক মৃণাল সেনের ছবি 'বাইশে শ্রাবণ'-এ অভিনয় শুরু করার আগেই ছবির ছবির দুই প্রযোজক বিজয় চ্যাটার্জি ও ভোলা রায় তাঁর নাম পরিবর্তন করার প্রস্তাব দেন। মৃণাল সেন করেন নতুন নামকরণ। মাধুরী পাকাপাকি ভাবে হয়ে যায় মাধবী।

মাধবী মুখোপাধ্যায়
নাম পরিবর্তন করার বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মাধবী মুখোপাধ্যায় বলেছেন,"নাম পাল্টানোর বিষয়টা তখন আমার কাছে বড় ব্যাপার ছিল না। বড় কথা ছিল সংসার চালানো।" এই ছবিতে 'মালতী' চরিত্রে করার ক্ষেত্রে বা বলা ভালো চরিত্র হয়ে ওঠার জন্য তাঁকে সাহায্য করেছিলেন মৃণাল সেনের স্ত্রী গীতা সেন। তারপরে মাধবী সুযোগ পান আরেক যশস্বী পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের ছবি 'সুবর্ণরেখা'-তে। ছবিতে তাঁর অভিনীত চরিত্র 'সীতা' বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। তবে মাধবীকে সীতা হয়ে ওঠার জন্য ইগোতে ধাক্কা দিতে কুন্ঠাবোধ করেননি ঋত্বিক। কখনো তাঁকে তাতিয়ে দিতে বলেছেন 'তোমাকে দিয়ে হবে না। আমি রমাকে(সুচিত্রা সেন) নিয়ে নেব'। আবার কখনও তাঁকে বলেছেন ' তোমায় লং শটে সূতিকার মতো দেখায়। ক্লোজ-আপে ভালো লাগে না' -র মতো কথা। তারপরেও নিজের প্রতিভার গুনে সীতা চরিত্রটিকে পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন মাধবী। এরপর তিনি ডাক পান আরেক বিশ্ববরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে। সত্যজিতের অন্যতম ছবি 'মহানগর'-এ মাধবী অভিনীত চরিত্র 'আরতি' ছবির ভরকেন্দ্র। এই চরিত্রটি তাঁর অভিনয় জীবনে অন্তত মাত্রা যোগ করে। তারপর সত্যজিৎ যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাহিনি 'নষ্টনীড়' অবলম্বনে 'চারুলতা' তৈরি করেন তাতে চারুলতার চরিত্রে তিনি বেছে নেন মাধবীকেই। এরপর 'কাপুরুষ' ছবিতেও তিনি নেন মাধবীকে। মাধবীকে নিয়ে সত্যজিতের পথের পর ছবি করার মাঝেই এই দু'জনকে ঘিরে ফিল্মি পত্র-পত্রিকায় ও কাগজে শুরু হয় নানা গুঞ্জন। তবে নিজের আত্মসন্মান ও ব্যাক্তিত্বকে বজায় রেখে তার থেকে বেরিয়ে এসেছেন মাধবী। সুচিত্রা-সুপ্রিয়া-সাবিত্রী র মতো অভিনেত্রীদের পাশে নিজের অভিনয় দক্ষতায় একটা আলাদা জায়গা মে করতে পেরেছিলেন মাধবী তাই নয়, বরং তিনিই সেই সময়ে একমাত্র অভিনেত্রী তথা নায়িকা তিনি সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক এই ত্রয়ীর সঙ্গে কাজ করেছেন। এর বাইরে যেমন পূর্ণেন্দু পত্রীর সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি, তেমনই তরুণ মজুমদারের 'গণদেবতা'-তেও কাজ করেছেন। নায়িকা হয়েছেন উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে। উত্তম কুমারের সঙ্গে 'থানা থেকে আসছি', 'শঙ্খবেলা','ছদ্মবেশী', 'ছিন্নপত্র', 'বিরাজ বৌ' এর মতো ছবির পাশাপাশি উত্তমকুমারের পরিচালনায় 'বনপলাশীর পদাবলী' ছবিতে কাজ করেছেন মাধবী মুখোপাধ্যায়। আবার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে'চারুলতা', 'কাপুরুষ', 'পরিশোধ' এর মতো একাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। এর পাশাপাশি 'সুবর্ণলতা', 'বিন্দুর ছেলে' -র মতো ছবিতেও মাধবী মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় দাগ কেটে গিয়েছে দর্শকদের মনে। 'দিবারাত্রির কাব্য' ছবিতে অনন্য অভিনয়ের সুবাদে তিনি পান জাতীয় পুরস্কার। তবে এতোকিছু প্রাপ্তির পরেও অমায়িক মাধবী মুখোপাধ্যায়ের মন্তব্য,"সেই পাঁচ বছর বয়স থেকেই অভিনয়ের পথে চলা শুরু করেছি। চলতে চলতেই এসব প্রাপ্তি ঘটেছে আমার জীবনে।" এহেন মাধবী মুখোপাধ্যায় বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম অভিনেতা নির্মল কুমারের সঙ্গে। দুই কন্যা রয়েছে তাঁর। অভিনয়ের পাশাপাশি ছবিও পরিচালনা করেছেন মাধবী মুখোপাধ্যায়। চিত্তরঞ্জন ঘোষের লেখা 'আত্মজা' ছবির হাত ধরেই পরিচালনায় পা রাখেন মাধবী। এছাড়াও ছোটপর্দায় 'নিষ্কৃতি' নামে একটি ধারাবাহিকও পরিচালনা করেছেন তিনি। এখনও সমানভাবে কাজ করে চলেছেন বড়পর্দা ও ছোট পর্দায়। তবে তারপরেও লেক গার্ডেন্সে দোতলার ফ্ল্যাটে একাকী থাকেন তিনি। নির্মলকুমারের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়নি তাঁর। কিন্তু আত্মসন্মানকে বজায় রেখে একাই থাকেন এখনও তিনি। যদিও স্বামীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। সম্প্রতি মাধবী পা দিলেন ঊনআশিতে। আশির দিকে অগ্রসর হয়েও মাধবী মুখোপাধ্যায় আজও সমানভাবে উজ্জ্বল। চারুলতার ঔজ্জ্বল্যে এতটুকু ভাঁটা নেই। বরং রয়েছে জেদ। ভালো কাজের খিদে। আর নিজের সাধ্যটুকু নিয়ে মানুষের সেবা করার চেষ্টা। এই নিয়েই বিরাজমান মাধবী মুখোপাধ্যায়। বাংলা চলচ্চিত্রের এক অন্যতম নক্ষত্র।
Make a Donation
A/C: 40910100004585 IFSC Code:BARB0BUDGEB
Bank Name: Bank Of Baroda
Name in Bank: BHAAN





Comments