মঞ্চ ও অমঞ্চের রঙ্গকথন
- Dec 30, 2020
- 3 min read

সরিৎ দত্ত
কথা হচ্ছিলো বিকল্প থিয়েটার নিয়ে । এবং, প্রথাগতভাবেই, বিতর্ক, অবশ্যম্ভাবী । প্রথমত, বিকল্প শব্দটি । এই
শব্দটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই একটা সত্য আড়াল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে, যে, আমরা থিয়েটার এর প্রকৃত
অবস্থান হিসাবে ধরেই নিচ্ছি একটা প্রসেনিয়ম, একদিক খোলা মঞ্চ, আলো, শব্দ, সবমিলে একটা মায়া...
দ্বিতীয়ত, সামগ্রিকভাবে শব্দবন্ধটা, "বিকল্প থিয়েটার ".... তাহলে তার উদ্দেশ্য কি প্রকৃত থিয়েটার থেকে পৃথক?
খুলে কই...
থিয়েটারে অভিনেতা ও দর্শকের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন সম্ভব? দুজনের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া সম্ভব? দর্শক কি
নাট্যানুষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে? নিষ্ক্রিয় দর্শককে কি সক্রিয় করা যায়? অভিনেতা ও দর্শকের
মধ্যেকার স্থানিক দূরত্ব ঘোচানো কি সম্ভব? প্রসেনিয়াম মঞ্চ, আলো, আবহসঙ্গীত, স্লাইড প্রজেকশন, সাউন্ড
এফেক্ট, পোশাক, দৃশ্যপট, মঞ্চোপকরণ যাদের সম্ভব নয়, তাদের জন্য নাট্যাভিনয় কি সম্ভব নয়? এরপরও, বিপুল
সমারোহের বাইরেও থিয়েটার ‘গণমাধ্যম’ হয়ে উঠতে পারে। আসলে অভিনেতা ও দর্শকের জীবন্ত উপস্থিতি ছাড়া
থিয়েটার অসম্পূর্ণ। মঞ্চের অসমতলীয় অবস্থান থেকে সরে এসে, একটি নির্দিষ্ট পরিশীলিত ঘরে অভিনয়
অনুষ্ঠানকেই অন্তরঙ্গ থিয়েটার বলা সঙ্গত? মঞ্চোপযোগী সমস্ত উপাদান-উপকরণ নিয়ে, শুধুমাত্র সমতলীয় দর্শক
সংস্থাপন হলেই অন্তরঙ্গতা তৈরি হয় এ প্রশ্ন বহুদিনে।
প্রথাগত থিয়েটারে অর্থাৎ প্রসেনিয়াম থিয়েটারে কি অভিনেতা, অভিনয়ক্রিয়া এবং দর্শকের মধ্যে সম্পৃক্তিকরণ
(প্রক্সিমিটি) গড়ে তোলা একেবারেই সম্ভব নয়? ত্রিমাধ্যমের পারস্পরিক সম্পৃক্ত হয়ে থাকাই কি অন্তরঙ্গতার এক
ও একমাত্র বিচার্য? উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি বহুবার। বহুবার এমন মনে হয়েছে, একাডেমি কিংবা
রবীন্দ্রসদনের শেষ রো-তে বসে কোনও নাট্যপ্রযোজনার কার্টেন কলের পরেও নিভৃতে কেঁদেছি একা একা। হয়তো
সেই নাটকের শেষ দৃশ্য এমনভাবে ছুঁয়ে গেছে, এমনভাবে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে গেছে, বুঝতেই পারিনি
কখন নাটক শেষ হয়েছে! এমনই অন্তরঙ্গ হতে পেরেছি সেই নাট্যের সাথে, সেই অভিনেতার সাথে। কিন্তু, সবটাই
ঘটেছে আমার একান্ত ব্যক্তিসত্ত্বায়। অন্ধকারে, মঞ্চ থেকে অনেকদূরের অসমতলে বসে, আমার ব্যক্তিগত চোখের
জলটাও থেকে গেছে আমারই কাছে। নাটকের শেষে মনে হয়েছে, ঐ যে-মানুষটার চরিত্র ‘সহৃদয় হৃদয়সংবাদী’র
মতো আমার হয়ে গেছে, যাই তাকে গিয়ে প্রচন্ডভাবে জড়িয়ে ধরি, উজাড় করে দিই, সমর্পণ করি নিজেকে।
আমার ‘বড়ো আমি’- টাকে কাছে এনে দেবার জন্য, ভিতরের সমস্ত তাপ-উত্তাপ বিনিময় করি তার সাথে। কিন্তু
সম্ভব হয় কি? হতে পারে কি? সম্ভব নয়, জানি। আসলে সেই অভিনেতা আর আমার( দর্শকের) স্থানিক দুরত্ব
থেকেই তৈরি হয়ে যায় বোধ, মনন আর হৃদয়ের মধ্যকার হাজার যোজন দূরত্ব। যে অভিনয় স্কিল আমাকে মুগ্ধ
করেছে, তা আসলে জাস্ট একটা পারফর্মেন্স ছাড়া আর কিছুই না। ফলত, নাটকের শেষে আমার উক্ত হর্ষ,
বেদনা, ক্ষোভ, অভিমান, ক্রোধ কিংবা ভালোবাসা- সবই তার (অভিনেতা) কাছে অনুভূতিহীন, মূল্যহীন, উত্তাপহীন
একটা অনাগ্রহের চর্চা ব্যতীত কিছুই নয়। স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন জাগে, এই অন্তরঙ্গতাও তো আসলে একধরনের
ফ্যান্টাসি। সিনেমা হল থেকে আসার সময় যে সুখানুভূতি, তার সাথে এই অন্তরঙ্গতার কোনও পার্থক্য নেই। দুটো
ক্ষেত্রেই ক্ষণিকের অন্তরঙ্গ হবার একটা চূড়ান্ত ফ্যান্টাসি।
কিন্তু অপর দিকে নন-প্রসেনিয়ামের আঙিনায় অভিনেতা – দর্শক একাত্ম হতে পারে অতি সহজেই। যে আমি
একাডেমি বা রবীন্দ্রসদনে প্রসেনিয়ামের নাটক দেখে মনের মুগ্ধতা আর অভিনেতার সাথে স্থানিক দূরত্বকে সঙ্গী
করে অন্তরঙ্গ হবার বদলে একটা চূড়ান্ত ফ্যান্টাসি নিয়ে বাড়ি ফিরি সেই আমিই আবার কখনও শিয়ালদার
লোরেটো-হাউসে কখনও নাকতলার নিরঞ্জন সদনে আবার কখনও বা বাংলা একাডেমির সামনের চাতালে
দর্শকাসন থেকে সরাসরি উঠে গেছি ‘মিছিল’-এর জনতায়, কখনও বা হয়ে গেছি ‘মুক্তধারা’র শ্রমিক – গ্রামবাসীর
অভিনেতা হিসেবে। আবার পরমুহূর্তেই ফিরে গেছি নিজের দর্শকাসনে। এখানে তো কোনো অসুবিধা হয়নি
অভিনেতার সাথে একাত্ম হতে, অন্তরঙ্গ হতে। অন্তরঙ্গ থিয়েটার আসলে একটা মনন-কে আশ্রয় করে নির্মিত হয়।
Audience-Performer-Space-Togetherness, — এই সমন্বয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হয় অন্তরঙ্গ থিয়েটারকে। এক নিবিড় অনুশীলন এর ভিত্তি। স্পষ্ট বিশ্বাস, স্পষ্ট বিষয় এবং স্পষ্ট সাংস্কৃতিক ভিত্তি নিয়েই অন্তরঙ্গ নাটকের পথ চলা। আসলে, থিয়েটার বরাবর-ই সময়ের কাছে দায়বদ্ধ। সময়ের দাবি মেনেই তাকে নতুন আঙ্গিকে, নতুন দর্শনে প্রকাশিত হতে হয়েছে বারবার। তাই, অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের মতোই, থিয়েটারেরও একটা স্পর্ধা আছে। প্রথাগত যা কিছু, তাকে সে ভাঙতে চায়, বদলাতে চায়। বিকল্পের সন্ধান, সে করবেই। আর এই বিকল্পের খোঁজ মানে আসলে বিষয় অনুসন্ধান, আর তার সাথে পূর্বে কথিত Audience-Performer আর Space- এর অনুসন্ধান। এই Togetherness-এর সাথে হৃদয়ের তাপ-উত্তাপ আদান-প্রদানের খোঁজ, এই থিয়েটারের
পাথেয়। ফলে, বিকল্প অনুসন্ধানে অন্তরঙ্গ তো হতেই হবে। অন্তরঙ্গ না হলে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলা অসম্ভব।
বিকল্প মানেই সে অ্যান্টি-এস্টাব্লিশমেন্ট -এর বাহক, নতুনের দিশারী।
কিন্তু সমস্যা অন্যতর ।
এই যে এতক্ষণের বলা পরীক্ষা নিরীক্ষা, বিকল্প থিয়েটার সম্বন্ধে এতো বিস্তার, এর কতটা নোতুন এক্সপেরিমেন্ট
এর ফসল? আমার তো মনে হলো, এই প্রয়োগ পদ্ধতি আমাদের লোকশিল্পে অনেক প্রাচীন...
পাঠক, গ্রামে কীর্তনের আসর দেখেছেন? ভাসানের গান? শয়লা? গ্রামের ভিতরে একটা আটচালা, দর্শকের একই
উচ্চতায় , একই আলোয়, কেবল অভিনয়ের জায়গাটুকু দড়ি দিয়ে ঘেরা, অভিনেতারা কোনো মেকআপ বা
সাজপোশাক ছাড়া, কিন্তু কি অসামান্য ইম্প্রোভাইজেশন!!!
তাহলে এই যে শাহরিক এক্সপেরিমেন্ট, এ আর বিকল্প কোথায় হলো!




Comments