//azoaltou.com/afu.php?zoneid=3651748 //azoaltou.com/afu.php?zoneid=3683887
top of page
Search

রাজনীতির সংস্কৃতি ও সংস্কৃতির রাজনীতি - শুভনীল চৌধুরী

  • May 8, 2021
  • 9 min read

Updated: May 9, 2021



পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে আমার বিশেষ কোনো দক্ষতা নেই। আর পাঁচটা সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক সংস্কৃতি বলতে যা বোঝে তার বেশি কিছু বোঝার ক্ষমতা আমার নেই, সেই দাবিও আমার নেই। তবু সম্পাদকমশাই-এর অনুরোধ অনেক চেষ্টা করেও ফেলতে পারলাম না। অতএব, এই নিবন্ধ।


লিখতে হবেই, আর এড়ানো যাবে না—এই কথা যখন বুঝতে পারলাম, ভাবতে শুরু করলাম কী নিয়ে লেখা যায়। সংস্কৃতি নিয়ে আমার জ্ঞান তো প্রায় শূন্য। এই ভাবনার মাঝে পাশের রাস্তা দিয়ে তৃণমূলের মিছিল গেল। মিছিল নয়, যেন দুর্গা পুজোর ভাসান! ‘খেলা হবে, খেলা হবে’-তারস্বরে ডিজে মাইকে গান বাজছে আর উদ্দাম নৃত্য করছে একদল যুবক। রাজনৈতিক সংস্কৃতি বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে কী রূপ নিয়েছে বুঝতে আর বাকি থাকল না। ‘খেলা হবে’ ক্ষীণতর হওয়ার পরে আবার কম্পিউটারের সামনে বসলাম। আলস্যের আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে ভাবলাম একবার ফেসবুক দেখি। খুললাম। সেখানে দেখলাম বামপন্থীরা কোনো একটি বিধানসভা আসনের জন্য মনোনয়ন জমা দিতে যাচ্ছে। সঙ্গে তারস্বরে বাজছে, ‘টুম্পা সোনা’ এবং সঙ্গতে উদ্দাম নাচ। বুঝলাম বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে টুম্পা সোনার হাত ধরে বিপ্লব এসেছে। এর কয়েকদিন পরে বাবুল সুপ্রিয়-র রোড শো-এর মুখোমুখি হতে হল। দেখলাম টালিগঞ্জের বুকে গেরুয়া পরিহিত কিছু যুবক ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে দিতে বাবুলের হুড খোলা গাড়ির পেছনে হাঁটছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির আঙিনায় আমাদের পশ্চিমবঙ্গে ধর্ম এসে ঢুকে পড়েছে।



রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতির নিশ্চিতভাবেই আরো বহু দিক রয়েছে। কিন্তু এই বিধানসভা নির্বাচনে সর্বাধিক নজরে পড়েছে এই তিনটি নতুন উপাদান—‘খেলা হবে’, ‘টুম্পা সোনা’ এবং ‘জয় শ্রীরাম’।

তৃণমূল, বামপন্থী অথবা বিজেপি প্রত্যেকেই তাদের রাজনৈতিক স্লোগান বা গান ইত্যাদির সমর্থনে একটি আপাত অকাট্য যুক্তি দেয়—‘মানুষ আজকাল এটাই চাইছে’। এই কথা বলার পরে মনে হয় যেন আর কোনো তর্ক চলে না। মানুষ যদি মনে করে টুম্পা সোনা শুনবে আর ‘খেলা হবে’-র সঙ্গে নাচবে, তবে আর কী বলার থাকতে পারে? থাকে, যদি উদ্দেশ্য এটা হয় যে মানুষকে তার দৈনন্দিন পুঁজিবাদের পাঁকে নিমজ্জিত জীবন থেকে উত্তরণ করব। পুঁজিবাদের থেকে উত্তরণ বিষয়টি খুব কঠিন, ভোটের সময় চলে না। অতএব এই যুক্তিও কেউ মানবেন না। তবু ‘মানুষ আজকাল এটাই চাইছে’ এই যুক্তিটি অন্তত বামপন্থীদের মানায় না। তৃণমূল ও বিজেপি-র ক্ষেত্রে মানায়।


তৃণমূল একটি রাজনীতিবিহীন, আদর্শবিহীন রাজনৈতিক সমষ্টি যা একটি ব্যক্তিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতি-র নামে সমাজের যা পাঁক, তাকে বাঁচিয়ে শুধু নয়, তাকে আরো বাড়তে দিয়ে সর্বাধিক জনসমর্থন আদায় করাই এই দলটির লক্ষ্য। সমাজে মানুষ যখন সমষ্টিগতভাবে বাঁচে তখন সেই মানুষের মধ্যেই নানান মতাদর্শ কাজ করে যা সমাজের স্বতঃস্ফু্র্ততা এবং ক্ষমতার বিকর্ষণে তৈরি হয়। এই সমাজেই পর্ণোগ্রাফি আছে, অকথ্য গালি-খিস্তি আছে, জাতি ভেদাভেদ আছে, সাম্প্রদায়িক মানসিকতা আছে। যে কোনো প্রতিক্রিয়াশীল প্রবণতাকেই তৃণমূল চ্যালেঞ্জ জানায় না, কারণ তার সে দায় নেই। অতএব, রাজনৈতিক শহীদ মঞ্চে ‘পাগলু ডান্স’-এর সঙ্গে নাচ, তৃণমূলেই শোভা পায়। তাতে তৃণমূলের যে কোনো ক্ষতি হয়, তা নয়, একথা প্রমাণিত। কিন্তু সংস্কৃতির নামে গোঁড়া, বস্তাপচা টেলি-সিরিয়ালের নায়ক-নায়িকারা বিদ্বজন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, সিনেমার নায়ক-নায়িকারা কোনো রাজনৈতিক শিক্ষা ছাড়াই রাতারাতি সাংসদ বা বিধায়ক হয়ে যান। সমাজের মধ্যে যে সাংস্কৃতিক পচন রয়েছে, তাকেই পুঁজি বানিয়ে তৃণমূলের যাত্রা। তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে তাদের স্লোগান হয়ে ওঠে, ‘খেলা হবে’। রাজনীতি যে খেলা নয়, মানুষের জীবনের সঙ্গে তা সম্পৃক্ত, বহু মানুষের বাঁচা-মরা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-খাদ্য-বাসস্থান যে রাজনীতি দ্বারাই নির্ধারিত হয়, এই মৌলিক কথাটি হারিয়ে যায়। তৃণমূলের ভোট কৌশলী তাই অনায়াসেই বলতে পারেন যে ‘খেলা হবে’ একটি যুদ্ধনাদ (War cry) যা তাদের কর্মী বাহিনীকে উজ্জীবিত করে। খেলা হওয়ার পরে কী হবে, খেলার ফল কী হবে, খেলার পরে জনগণের কী লাভক্ষতি হবে তা এই যুদ্ধনাদের দাপটে হারিয়ে যায়। সঙ্গে মেশে গানের সুর, রাস্তায় নাচে যুবক-যুবতীরা—‘খেলা হবে’। রাজনীতি বর্জিত রাজনৈতিক স্লোগানের উদাহরণ দিতে হলে আগামী প্রজন্ম ‘খেলা হবে’-কে সামনের সারিতে রাখবে।


বিজেপি-র অবশ্য এ্যাজেণ্ডা অন্য। তারা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি নতুন সংস্কৃতি আমদানি করতে চায়, যার চাষ তারা করেছে উত্তর ভারত তথা হিন্দি বলয়ে। রামের নামে রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে নতুন। হিন্দুত্ব এবং সাম্প্রদায়িকতার যেই আখ্যান বিজেপি তৈরি করেছে গোটা দেশে তারই অঙ্গ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানের আমদানি। শুধু তাই নয়। উত্তরপ্রদেশ তথা অন্যান্য রাজ্যে রামনবমীকে কেন্দ্র করে যে ডিজে-রা গান তৈরি করেন, তার অধিকাংশই তীব্রভাবে পুরুষতান্ত্রিক এবং সাম্প্রদায়িক। উত্তেজক সুরের সঙ্গে বিভিন্ন ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক স্লোগানকে মিশিয়ে হিন্দুবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার এক চূড়ান্ত উত্তেজনা তৈরি করে এই গানগুলিকে। পশ্চিমবঙ্গেও রামনবমীকে কেন্দ্র করে নিকট অতীতে যে সাম্প্রাদায়িক উত্তেজনার ঘটনাগুলি ঘটেছে সেখানেও এইধরনের ডিজে গান বাজানোর খবর আছে, বিশেষ করে মুসলমান অঞ্চলে। মন্দিরের সংখ্যা বৃদ্ধি, হিংস্র হনুমানের মুখ বিভিন্ন জায়গায়, বিজেপি-র ঝাণ্ডার পাশেই হিন্দু গেরুয়া ঝাণ্ডা আজ তাই স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। এই স্বাভাকিতা আসলে হিন্দু নামক একটি পরিচিতি সত্ত্বার নির্মাণ যা বিজেপিকে ভোটের বৈতরণী পার করার উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি বা শহুরে যে মধ্যবিত্ত সংস্কৃতি এতদিন পরিচিত ছিল, সেই সংস্কৃতির পাশেই বা তাকে প্রতিস্থাপন করে হিন্দুত্ববাদী এক উগ্র সংস্কৃতির জন্ম দিতে চায় আরএসএস-বিজেপি। বাম বা তৃণমূল সংস্কৃতির আঙিনায় বিশেষ কোনো সৃজনশীল হস্তক্ষেপ করেনি। তাদের রাজনৈতিক স্লোগানগুলিও তামাদি হয়ে গেছে বা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। এই দুই শূন্যতাকে ভরাট করার কাজ বিজেপি করেছে। ‘জয় শ্রীরাম’ তাই পশ্চিমবঙ্গেও স্বাভাবিকতা পেয়েছে।


বামপন্থীরা পশ্চিমবঙ্গে এক বিকল্প সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল। সেই সংস্কৃতি বিরাজমান সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে রসদ সংগ্রহ করেও তাকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিল। যেমন ধরা যাক সলিল চৌধুরীর বিখ্যাত গানের এই কথাগুলি,

“আজ নয় গুন গুন গুঞ্জন প্রেমে

চাঁদ-ফুল জোছনার গান আর নয়

ওগো প্রিয় মোর, খোল বাহুডোর

পৃথিবী তোমারে যে চায়”

মূলধারার গান, কিন্তু এই মূলধারার গানের মধ্যেই নিহিত রয়েছে মূলধারার একটি সমালোচনা বা critique , যা বলছে মূলধারার প্রেমের গান পেড়িয়ে পৃথিবীর দিকে হাত বাড়াতে হবে। বামপন্থী চেতনায় সম্পৃক্ত না হলে সলিল চৌধুরীর পক্ষে এই গান লেখা সম্ভব হত না। মূলধারার মধ্যে বামপন্থী চেতনাকে সম্পৃক্ত রাখার মতন শিল্পীর আজ অভাব রয়েছে। এর কারণ জটিল। প্রথমত, সেই যুগের বামপন্থীরা যেই দিনবদলের স্বপ্ন মানুষকে দেখিয়েছিলেন, যেই আন্দোলন তাঁরা করেছিলেন, তার পরিণামে অসংখ্য মেধাবী শিল্পী, সাহিত্যিক, চিত্রকর, নাট্যকার, পরিচালক, বামপন্থী ভাবধারায় দিক্ষিত হন। এটা কাকতালীয় নয় যে সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জর্জ বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ঋত্বিক ঘটক, বিজন ভট্টাচার্য, বা অন্যান্যরা বামপন্থী হয়েছিলেন। সেই সময়ের মেধাবী শিল্পীর মনেই বাম ধারা বইত, কারোর ক্ষেত্র সেই ধারা জাহ্নবী, কারোর ক্ষেত্রে বা ছোট নদী। তবু ধারাটি মনকে সিঞ্চন করত এক নতুন ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষায়। আজ বামপন্থী আন্দোলনের সেই জোয়ার আর নেই। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, চীনের পুঁজিবাদী ঝোঁক, পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীদের নবউদারবাদের সঙ্গে আপোস, সব মিলিয়ে বাম রাজনীতি নতুন দিনের স্বপ্ন মানুষের মনে জাগাতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই বামেদের সংস্কৃতির জগতটাও দখল নিয়ে নিয়েছে টেলি-সিরিয়াল বা ফিল্মের মধ্যমেধার নায়ক-নায়িকারা, যারা এমনকি ব্রিগেডে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যানের যা করার কাজ, সেই অনুষ্ঠান সংযোজনার কাজটিরও ভার পেয়ে যাচ্ছেন। কেন? না মানুষ নাকি এটাই চাইছে।



এই আলোচনার সন্দর্ভে হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসের কথা মনে পড়ে গেল। গল্পটি সবার জানা। গোরা নিজেকে একজন খাঁটি সনাতনী হিন্দু ব্রাহ্মণ মনে করেন। তিনি হিন্দু ধর্মের সর্বাধিক গোঁড়া এবং অন্ধবিশ্বাসগুলিকে নিজের জীবনে স্থান দিয়েছেন, একাগ্র চিত্তে তা মেনে চলেন। জাতপাত ব্যবস্থা, মুসলমানদের সঙ্গে দূরত্ব, ব্রাহ্মদের বিরোধিতা, নারীদের অধিকার বিষয়ে তাচ্ছিল্য-অবজ্ঞা-বিরোধিতা সবই তিনি করে চলেছেন। কোন যুক্তিতে? না, আমার দেশের অধিকাংশ মানুষ এই আচারগুলিতে বিশ্বাস করে, আমার দেশের অধিকাংশ মানুষ যা বিশ্বাস করে, যেই আচার পালন করে তা যদি আমি পালন না করি তবে দেশের মানুষের আপনজন হয়ে উঠব কী করে? তা যদি না হয়ে উঠতে পারি তবে তাদের সেবা করব কী করে? গোরা-র এই যুক্তির একটা জোর আছে। বলা যেতে পারে আজকের বিজেপি-ও মৌলিকভাবে এই যুক্তি দিয়েই তাদের হিন্দুত্ববাদের প্রচার ও প্রসার করে। দেশের মানুষের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে, তাদের সমস্ত আচার-নিয়ম-কানুন-ধর্মকে তাচ্ছিল্য করে দেশের মানুষের মন জয় করা যায় না। কিন্তু তাই বলে সমাজের যে নিকৃষ্টতম মূল্যবোধ তাকে আঁকড়িয়ে ধরে কি দেশের মানুষের সেবা করা যায়, না করা উচিত? উপন্যাসের একদম শেষ লগ্নে এসে গোরার বোধদয় হয়। সে বলে,


“আমি যা দিন-রাত্রি হতে চাচ্ছিলুম অথচ হতে পারছিলুম না, আজ আমি তাই হয়েছি। আমি আজ ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দু মুসলমান খৃস্টান কোনো সমাজের কোনো বিরোধ নেই। আজ এই ভারতবর্ষের সকলের জাতই আমার জাত, সকলের অন্নই আমার অন্ন। দেখুন, আমি বাংলার অনেক জেলায় ভ্রমণ করেছি, খুব নীচ পল্লীতেও আতিথ্য নিয়েছি--আমি কেবল শহরের সভায় বক্তৃতা করেছি তা মনে করবেন না--কিন্তু কোনোমতেই সকল লোকের পাশে গিয়ে বসতে পারি নি--এতদিন আমি আমার সঙ্গে সঙ্গে একটা অদৃশ্য ব্যবধান নিয়ে ঘুরেছি--কিছুতেই সেটাকে পেরোতে পারি নি। সেজন্যে আমার মনের ভিতরে খুব একটা শূন্যতা ছিল। এই শূন্যতাকে নানা উপায়ে কেবলই অস্বীকার করতে চেষ্টা করেছি--এই শূন্যতার উপরে নানাপ্রকার কারুকার্য দিয়ে তাকেই আরো বিশেষরূপ সুন্দর করে তুলতে চেষ্টা করেছি! কেননা, ভারতবর্ষকে আমি যে প্রাণের চেয়ে ভালোবাসি--আমি তাকে যে অংশটিতে দেখতে পেতুম সে অংশের কোথাও যে আমি কিছুমাত্র অভিযোগের অবকাশ একেবারে সহ্য করতে পারতুম না। আজ সেই-সমস্ত কারুকার্য বানাবার বৃথা চেষ্টা থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে আমি বেঁচে গেছি”


অর্থাৎ, গোরার এক নতুন উপলব্ধি হয়, সে এক নতুন তত্ত্বের পথে পা বাড়ায়, যা উপস্থিত জাতি-ধর্ম দ্বারা খণ্ডিত ভারতবর্ষের বাইরে এক নতুন ভারতীয় পরিচিতির নির্মাণ করে। এই উপলব্ধি আসা মানেই এই নয় যে ভারতের মধ্যে যে বিভিন্ন পশ্চাদপদ ধর্মবিশ্বাস ও আচার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তার মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে। গোরার মধ্যে এই বিশ্বাস এক নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়। আমরা ভাবতেই পারি এই নতুন ভারতীয়তার তত্ত্ব ও সংজ্ঞাকে ভর করে গোরা আবার ফিরবে মানুষের মধ্যে এবং তাদেরকেও তাঁর নিজের এই ভাবনার দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য আবেদন করবে। মানুষের উপস্থিত চেতনার স্তর থেকে উন্নততর চেতনার দিকে অগ্রসর করায় ব্রতী হবে গোরা, যেই কাজ বামপন্থীদের মৌলিক কর্তব্য।


আমাদের আলোচ্য বিষয়ের ক্ষেত্রে গোরার এই উত্তরণের গুরুত্ব এখানেই যে সমাজে বিদ্যমান যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল রয়েছে তাকে পরম ধরে নিয়ে সেই পরিধিতেই বামপন্থীরা নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখলে তাদের আর তৃণমূলের মধ্যে কোনো তফাত থাকে না। সমাজের বিদ্যমান জনজীবনের জনপ্রিয় ছবিগুলিকে পরম সত্য ধরে নিলে বামপন্থীদের মস্ত বড়ো ভুল হয়ে যাবে। টুম্পা সোনা গানটি ইউটিউবে কোটি কোটি মানুষ দেখেছেন মানে এই নয় যে সংস্কৃতির কষ্টিপাথরে তা পাশ হয়ে গেছে। তাই যদি হত তবে জর্জ বিশ্বাসের গানগুলি আমাদের ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া উচিত। বামপন্থীদের গোরার মতন উত্তরণের তত্ত্বে পৌঁছতে হবে। তার মানে এই নয় ভোটের সময় কিছু গম্ভীর তত্ত্ব কথা মানুষকে শোনাতে হবে। কিন্তু আজ ফেসবুকে ‘টুম্পা সোনা’কে তত্ত্বায়িত করার যে উদগ্র বাসনা বামপন্থী কর্মীদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে তা দেখে মনে হয় সংস্কৃতির নামে এক বিক্রিত জনপ্রিয় রুচি যা লুঙ্গি ডান্স এবং টুম্পা সোনাকে গানের মর্যাদা দেয়, তা বামপন্থীদের মনেও পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছে। সমস্যাটা এখানে।


জনপ্রিয় সংস্কৃতি মানেই তা খারাপ বা জনপ্রিয় সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ বর্জন করার কথা এখানে বলা হচ্ছে না। সলিল চৌধুরীও জনপ্রিয় ছিলেন, কিন্তু তিনি হানি সিংহ ছিলেন না। এই তফাতটা বামপন্থীরা না করতে পারলে আর কে করবে? সমস্যা হল জনপ্রিয়তার ধারণাটি বামপন্থীদের ফলিত রাজনীতির সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছে। ‘হেই সামালো ধান হো’-গানটির মতন না হলে সব গান ফালতু হয়ে যাবে এমন কথা পাগলেও বলছে না। কিন্তু যা জনপ্রিয় হচ্ছে তার সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দিকটি না বুঝলে বামপন্থীদের চলে না। পশ্চিমবঙ্গে বা ভারতের শ্রমজীবি জনতার সামনে আজ সুস্থ সংস্কৃতির আকাল দেখা দিয়েছে। তাদের জীবন আজ দুর্বিসহ। রোজ খেটে বাড়ি ফিরে তারা রবীন্দ্রনাথ পড়বেন বা রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনবেন এই আশা করা বাতুলতা। ঠিক এখানেই বাজারের ভূমিকা। বাজার জানে যে রবীন্দ্রসঙ্গীতের রসাস্বাদন করতে হলে শ্রোতার একটা প্রাথমিক শিক্ষা লাগে, যা ‘টুম্পা সোনা’ বা ‘লুঙ্গি ডান্স’-এর ক্ষেত্রে লাগে না। এই গানগুলি চটুল সুরে কোমড় দোলানোর জন্য তৈরি। গানের ভাষা ও সুর মানুষকে শুধু উত্তেজিত করতে পারে, কিন্তু কোনো সাংস্কৃতিক ব্যঞ্জনা তৈরি করতে পারে না। তাই এই গানগুলি হিট হলেও, এগুলি আর যাই হোক সঙ্গীত নয়। বামপন্থীদের প্যারোডি হয়ত তাদের বক্তব্য বহু মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছে কিন্তু তা প্রোথিত রয়েছে শ্রমজীবি মানুষের সংস্কৃতির একটি বিকৃত ধারণায়। নারীবাদিরা ‘টুম্পা সোনা’ নিয়ে যে আপত্তিগুলি তুলেছেন সেগুলি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমার আপত্তি এই গানটিকে মাধ্যম করা নিয়ে এবং তাকে তত্ত্বায়িত করে বলা যে শ্রমজীবি মানুষের সংস্কৃতির অনুসারী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস নিয়ে। এমনকি এই অবধিও বলা হয়েছে যে এই গান নিয়ে যারা আপত্তি জানাচ্ছেন সবাই এলিট সম্প্রদায়ের লোক।


আসলে শ্রমজীবি মানুষের সংস্কৃতি আছে না নেই, থাকলে তার রূপ কেমন? এই সমস্ত ধারণা বা বিতর্কগুলি বামপন্থী রাজনীতির পরিসর থেকে বিতারিত হয়েছে। অবশ্যই শ্রমজীবি মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখছেন,

“নিম্নবিত্ত শ্রমজীবির সংস্কৃতিচর্চার উৎস হল তার জীবিকা। তাঁর শ্রমের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন বলে তাঁর সংস্কৃতিকে উপরি-কাঠামোর পর্যায়ে ফেললে ভুল করা হবে। সংস্কৃতিচর্চা তাঁর কাছে কেবল মনোরঞ্জনের ব্যাপার নয়। কৃষক যখন গান করেন তখন মন হাল্কা করার উদ্দেশ্যে করেন না। গান না-করলে তাঁর শ্রম অব্যাহত রাখা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় বলেই তাঁকে গাইতে হয়। শরীরের সঙ্গে গানও তাঁকে জমিতে খাটতে সাহায্য করে”।

তিনি আরো বলছেন,

“লেখক ও শিল্পীর হাতে নিম্নবিত্ত শ্রমজীবির সংস্কৃতি উঁচুদরের শিল্পে পরিণত হয়। উত্তর ভারতের লোকগীতির সুর বড় বড় শিল্পীর হাতে বিবর্তিত হয়ে রাগ-রাগিণীর পর্যায়ে উঠেছে। লোকের মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনি অবলম্বনে গড়ে উঠেছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যগুলো”।


অতএব, নিম্নবিত্ত শ্রমজীবির সংস্কৃতি মাত্রেই তা ত্যাজ্য নয়। বরং নিম্নবিত্তের শ্রম, তাদের যাপন থেকে উঠে আসা গানে যে প্রাণ রয়েছে সেটাই মানব সংস্কৃতির আদি রূপ। বামপন্থীরা সেই শ্রমজীবিদের মাঝখানে এখন আর নেই। তাই মূলধারার গানে অথবা চাষির ঘরের গানের মধ্যে বামপন্থী অনুরণন আর খুব বেশি দেখতে পাওয়া যায় না। এই নির্বাচনে ‘টুম্পা সোনা’ গানের মধ্যে দিয়ে যা মানুষের সংস্কৃতি বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তা আদৌ শ্রমজীবি মানুষের জীবনসম্পৃক্ত সংস্কৃতি নয়। কিন্তু কোনটা শ্রমজীবি মানুষের সংস্কৃতি তা জানতে হবে। তা না জেনে বলিউডের তৃতীয় শ্রেণির গানকে নকল করে বামপন্থীরা প্যারোডি বানিয়ে তা নিয়ে প্রচার করলে ভোট পাওয়া যাবে কি না জানি না, তবে তা যে সংস্কৃতির বিচারে উত্তীর্ণ নয় তা বলাই যায়। আসলে তা মধ্যবিত্ত মধ্যমেধার সংস্কৃতির জনপ্রিয় রূপ। মনে রাখতে হবে গানটি জনপ্রিয় হয়েছে, তার মানেই এই নয় যে গানের রচয়িতা পার্টি ভোট পাবে।



উপসংহার

শেষে আগে বলা কথাগুলি একটু গুছিয়ে নেওয়া যাক। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে নতুন কিছু উপাদান যোগ হয়েছে তার মধ্যে মিল একটাই। সমস্ত দল ‘মানুষ এটাই চায়’-এই যুক্তিতে তাদের রাজনৈতিক স্লোগান এবং গান তৈরি করেছেন। তৃণমূলের রাজনীতির মধ্যেই এই জনপ্রিয়তাবাদী ঝোঁক রয়েছে। আবার বিজেপি এক নতুন সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে তৈরি করার চেষ্টা করছে যা হিন্দুত্ববাদের দ্বারা পুষ্ট। বামপন্থীদের এই রাজ্যে বেনজির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থাকলেও তারা যেই সংস্কৃতির থেকে ধার নিয়ে ‘টুম্পা সোনা’ গানটি তৈরি করেছেন তা শ্রমজীবি মানুষের সংস্কৃতি হতে পারে না। শুধু তাই নয়, মানুষ চাইছে, অতএব আমরা যা করছি তা ঠিক, এই মানসিকতা মানবমুক্তি ও উত্তরণের পথে বাঁধা ছাড়া আর কিছুই নয়। যদি সত্যিই বামপন্থীদের মানুষের কাছে পৌঁছতে হয় তবে তাদের জীবনযাপন ও নিত্যনৈমিত্তিক সংস্কৃতি চর্চার জগতে ঢুকতে হবে। একটি নির্বাচনে ‘টুম্পা সোনা’ গান হলে মহাভারত অশুদ্ধ যেমন হয় না, তেমনই একে জনগণের দাবি বলে চালানোটাও ঠিক নয়। যদি সত্যিই বামপন্থীরা লোকসংস্কৃতির জগতে ঢুঁ মারেন তবে অনেক মণিমুক্ত পাবেন যা দিয়ে তাদের রাজনীতি সার পাবে আগামীর গাছের জন্য। যেমন তারা পেয়ে যেতে পারেন এই গান,



মানুষ হয়ে মানুষ মানো

মানুষ হয়ে মানুষ জানো

মানুষ হয়ে মানুষ চেনো

মানুষ রতনধন

করো সেই মানুষের অন্বেষণ।



Make a Donation


A/C: 40910100004585


IFSC Code:BARB0BUDGEB


Bank Name: Bank Of Baroda


Name in Bank: BHAAN

 
 
 

Comments


Subscribe to Site

Thanks for submitting!

© 2020 Bhaan Theatre | Designed by Capturegraphics.in
bottom of page