//azoaltou.com/afu.php?zoneid=3651748 //azoaltou.com/afu.php?zoneid=3683887
top of page
Search

রবীন্দ্র গীতিনাট্য নৃত্যনাট্যের চরিত্রেরা এবং প্রেমের রাস

  • Dec 30, 2020
  • 9 min read


'ওহে জীবনবল্লভ, ওহে সাধন দুর্লভ সৃষ্টিকর্তা; তুমিই ফললাভের আনন্দস্বরূপ 'ব্রহ্মাস্বাদসহোদরা'। তুমিই দেব, তুমিই হৃদয়স্বামী; হে জীবনদেবতা, দুর্লভ সাধনের ধন, তোমারই অঙ্গুলি চালনায় বিশ্বচরাচর চালিত হয়। তুমিই সৃষ্টিকর্তা; তুমিই ফললাভের আনন্দস্বরূপ 'ব্রহ্মাস্বাদসহোদরা'। তুমিই দেব, তুমিই হৃদয়স্বামী; তুমি পূজ্য, তুমিই আবার প্রণয়ী; তোমাকে লাভের আকাঙ্ক্ষাতেই জগৎ প্রেমতুর-প্রেমতুরা।

তোমাকে তনু-মন সমর্পনে কখনো সে পুরুষ, কখনো বা নারী; কখনো সখা, কখনো প্রেমময়ী

মানসী। তুমিই সর্বজ্ঞ; তুমি শূণ্য-পূণ্য-ধী-স্থি অধীপ; আবার তুমিই হৃদয়াসনে বিরাজ করো-- তাই

তোমায় প্রণাম দেবো?  নাকি হৃদয়?  তুমিই জগতের উৎপত্তি; তোমাতেই প্রেমের নিবৃত্তি। কখনো

তুমি পিতা কখনো বা প্রাণেশ। ';তোমায় আমায় মিলন হবে বলে' ই যুগযুগান্ত ধরে কত না

আয়োজনে ব্যস্ত এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড। হে প্রাণাধিক, তোমার স্তবগানে মুখরিত হৃদয়; সেই 'প্রথম

দিনের উদয় দিগঙ্গন' থেকেই সে নাদ গুঞ্জরিত হয়ে চলেছে -

'শ্রিতকমলাকুচমন্ডল ধ্রুতকুন্ডল

কলিত ললিত বনমাল

জয় জয় দেব হরে।'

হে 'স্বামী', বড় বিচিত্র, বড় জটিল তোমার-আমার সম্বন্ধ-সম্পর্ক। এ যেন সংগীতে শ্রুতির

অবতারণা; সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নাড়ির মেলবন্ধন। এ যেন পৃথক হতে চায়না, হতে পারেনা। তুমিই

কেন্দ্রবিন্দু, তোমায় আবর্ত করেই কতনা বিচিত্র লীলা লীলায়িত হয়ে চলেছে। প্রাক-ইতিহাস

প্রাক-পুরাণ থেকে শুরু করে সেই জন্মজন্মান্তরের সম্পর্ক বয়ে চলেছে তার জীবনতরঙ্গ বদলে

যাচ্ছে শুধু কায়া কিন্তু অন্তরের ভাবচ্ছায়া সেই অবিনশ্বর প্রেম জ্যোতিতে ভাস্বর। আমি তোমার

চির-পূজারিনী; আমিই তোমার চরণ-বিলাসিনী। হে প্রাণের দোসর জন্মজন্মান্তরের খেলার সাথি

তো তুমিই। তুমিই আমার বাল্যসঙ্গী কখনো 'যমুনার কূলে নবনীপমূলে' আবার কখনো বা

তপোবনে অন্ধমুনীর পুত্র ঋষিকুমার রূপে আর তোমার খেলার সঙ্গিনী লীলা একাত্ম হয়ে যায়

সেই আমার সাথেই। মনে পড়ে সেই নিষ্পাপ সুখস্মৃতি; তুমি আমায় যত্নে সাজিয়ে দিতে হাতে

মৃণালবালা, কানে চাঁপার দুল, মাথায় বেলের সিঁথি আর খোঁপায় বকুলফুল দিয়ে। তপোবনের

আনাচে-কানাচে রয়ে গেছে তার স্বাক্ষর ; চির স্রোতস্বিনী তটিনী আজও গেয়ে চলে সেই


বাল্যলীলার আখ্যান বনদেবীদের আশীর্বানী সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু একদিন ছেলেবেলার খেলা সাঙ্গ

হলো চিরতরে কালমৃগয়ার অভিশপ্ত কষাঘাতে- খেলার সাথি যাত্রা করলো 'অনন্তধামে মোহমায়া

পাশরি'।

কিন্তু তুমিই তো বলেছো-

' বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়

নবানি গৃহ্নাতি নরোহপরানি

তথা শরীরানি বিহায় জীর্ণা

ন্যান্যহি সংযাতি নবানি দেহি।'

আমার আত্মা সুর মেলালো তোমার সুরে –


‘নতুন নামে ডাকবে মোরে ডাকবে

বাঁধবে নতুন বাহুডোরে

আসব যাব চিরদিনের সেই আমি।’

‘তখন আমায় নাই বা মনে রাখলে'- কিন্তু আমার প্রেমের সেই ভাবসম্পদ; তার অমৃত সুগন্ধ

পারিজাতের মতোই চির অমলিন, নিষ্কলঙ্ক তার পরিমল। জন্ম নিল আরেক বিচিত্র লীলার

প্রকাশ  প্রেমানুভূতি যে মায়াঞ্জন পরিয়ে দেয় তাতে আঁখির কাজ বন্ধ হয়; মরীচিকার ভ্রাম্যমানতা

তাকে তার স্বভাবসুলভতা থেকে বঞ্চিত করে - সৃষ্টি হয় 'মায়া'। 'মায়ার খেলা'য় সামিল হয় হৃদয়।

কিন্তু প্রেম তো সহজলভ্য বস্তু নয়; মায়ার পরত ভেদ করে তাকে জানতে হয়। নবযৌবন

উন্মেষের মাধুর্যতায় পরিপূর্ণা প্রমদা যখন নিজের সৌন্দর্য্যে নিজেই বিমোহিতা হয়ে গেয়ে

উঠলেন-

'দে লো, সখী, দে পরাইয়ে গলে

সাধের বকুলফুলহার

আধফুট জুঁইগুলি যতনে আনিয়ে তুলি

গাঁথি গাঁথি সাজায়ে দে মোরে

কবরী ভরিয়ে ফুলভার' - তখন আত্মলীলায় মত্ত প্রমদা প্রেমের পরিপূর্ণ রূপ বুঝতে কালক্ষেপ

করায় তার প্রেমাস্পদ চিরতরে হারিয়ে যায় তার কাছ থেকে। কিন্তু পরবর্তীতে যখন সে নিজে

নিজের হৃদয়ের ভাষা বুঝতে শেখে তখন সময় পার হয়ে গেছে - তার হৃদয়ে তখন এই বিলাপই

বোধহয় করে উঠেছিলো-

'আমার মন, যখন জাগলি না রে

ও তোর মনের মানুষ এলো দ্বারে।

তার চলে যাওয়ার শব্দ শুনে ভাঙল রে ঘুম-


ও তোর ভাঙল রে ঘুম অন্ধকারে।।'


কিন্তু আত্মমগ্নতা তথা আত্মলীলা তো বিদ্যাপতী রচিত শ্রীরাধার গুণবিশেষ; প্রসাধন চর্চিত

সজ্জার অন্তরালে বিদ্যাপতীর পদাবলী তে মিশেছিলো সাধনার ঐকান্তিকতা। সেখানে শৃঙ্গার

রসের ভোগবাদী প্রকাশের অন্তরালে দৈবী প্রেমভক্তির গভীরতা একাসনে বিরাজ করে।

বিদ্যাপতীর রাধা ব্যক্তিত্বসম্পন্না। গৌড়ীয় প্রেমধর্মের স্তর বিন্যাসে বয়ঃসন্ধি, পূর্বরাগ,অনুরাগ,

মান, অভিসার, প্রেম বৈচিত্ত্যের পথ বেয়ে বিদ্যাপতির রাধিকা মাথুরের বিরহে সিঞ্চিতা। তাঁর

শ্রীরাধিকা মুকুলিত যৌবন আবেশে নিজের দেহের মধ্যে একটি আত্মসচেতন নারীকে আবিষ্কার

করেছেন

'খনে খনে নয়ন কোণ অনুসরঙ্গ

খনে খনে বসন ধূলি তনু ভরঙ্গ'

তিনি চন্ডীদাসের রাধার মতো একান্ত কৃষ্ণময়ী নন, বিদ্যাপতির রাধা কৃষ্ণ প্রেমের পাশাপাশি তাঁর

স্বতন্ত্র সত্ত্বাকে হারায়নি তাই তিনি বলে ওঠেন

'তোমার অভিসারে যাব অগম পারে'।  কিন্তু পরিশেষে আধ্যাত্মিক কৃচ্ছসাধনাই যে অভিসারের পথ

তা তিনি বুঝতে পারেন সেই দুর্গম অভিযাত্রাই বিদ্যাপতীর রাধাকে প্রেমতাপসী ব্রতচারিণী

রাধাতে উন্নীত করে। রবি কবির ভাষায়-

'তোমার অভিসারে যাব অগম পারে

চলিতে পথে পথে বাজুক ব্যথা পায়ে

'মায়ার খেলা'র প্রমদাও পরবর্তীতে সেই কৃচ্ছসাধনই মেনে নেন-

'মায়ার খেলা'র প্রমদাও পরবর্তীতে সেই কৃচ্ছসাধনই মেনে নেন- নেন-

'হায় হায়, এ সংসার যদি না পূরিল

আজন্মের প্রাণের বাসনা,

চলে যাও ম্লানমুখে, ধীরে ধীরে ফিরে যাও-

থেকে যেতে কেহ বলিবে না।

তোমার ব্যথা তোমার অশ্রু তুমি নিয়ে যাবে-

আর তো কেহ অশ্রু ফেলিবে না।।'


'আপনারে লয়ে আপনি মত্ত' প্রমদা মায়ার পরত ভেদ করে তার প্রাণের দোসর কে চিনতে

কালক্ষেপ করেছিলেন; বুঝতে পারেন নি 'মায়ার ফাঁদ পাতা ভুবনে, কোথা কে ধরা পড়ে কে

জানে'!!! কিন্তু রাজনটী শ্যামা তো কালক্ষেপ করেন নি, শৃঙ্খলে জর্জরিত বজ্রসেন কে দেখে

তিনি প্রেমের শৃঙ্খলে নিজেই আবদ্ধ হয়েছিলেন; নিজেই ঘোষণা করেছিলেন 'সুন্দরের বন্ধন


নিষ্ঠুরের হাতে ঘুচাবে কে?' এবং উপায়ও তিনি বের করেছিলেন বজ্রসেনের শৃঙ্খল মোচনের।

নিঃসন্দেহে শ্যামার এই অভিপ্রায় প্রশংসার দাবী রাখত কিন্তু বাধ সাধলো সেই 'মায়া-অঞ্জন'।

হিতাহিতজ্ঞান শূণ্য শ্যামা জ্ঞেতসারে ঘটিয়ে ফেললেন চরম অঘটন; এক নিষ্পাপ প্রমিক হৃদয়ের

চড়লো বলি। শ্যামা যে বড়ো ভয় পেয়েছিলেন প্রেমাস্পদের সাথে তার মিলনের পথে কাঁটা হয়ে

থাকা সব প্রতিকূলতাকে। প্রেমিক বজ্রসেনের সাথে বিচ্ছেদের প্রবল ভয় তাড়নায় শ্যামা হয়ে

উঠেছিলেন উন্মত্তা। কোথাও কি শ্যামার হৃদয়তন্ত্রীতে ধ্বনিত হয়েছিলো কৃষ্ণ বিচ্ছেদে জর্জরিতা

রাধার প্রলাপ?

'সখী লো, দারুন আঁধিভরাতুর এ তরুণ যৌবন মোর।

'হায় একি সমাপন!লাহল জীবন করল অঘোর।।'

তৃষিত প্রাণ মম দিবসযামিনী শ্যামক দরশন-আশে।

আকুল জীবন থেহ না মানে, অহরহ জ্বলত হুতাশে।

'...্য কহি তোয়,'

খোয়াব কব হম শ্যামক প্রেম সদা ডর লাগয় মোয়।।'

প্রেমের কঠোর আত্মত্যাগ শ্যামার বুঝতে পারেন নি তাই তার সমাপন মধুরেণ হয় কি করে?!

শ্যামা বলে ওঠে

'হায় একি সমাপন!

অমৃতপাত্র ভাঙিলি, করিলি মৃত্যুরে সমর্পণ!

এ দুর্লভ প্রেম মূল্য হারালো হারালো

কলঙ্কে, অসম্মানে।।'


বিরহের দহনে দগ্ধ হয়েই আসে প্রেমের সার্থকতা বিরহ পরবর্তী মিলন যেন দুটি হৃদয়ের শ্রেষ্ঠ

সম্পদ হয়ে ওঠে। শীত যে বসন্তেরই ভূমিকা, শীতের ছল মাত্র; তাই সে নিয়ে আসে যৌবনের

প্রত্যাশা; বসন্তেরই ছদ্মবেশে বিরহও তেমনি বয়ে আনে আসন্ন মিলনের শুভমহরৎ। বিষন্না

রাধার কানে হঠাৎ যেন মধুবর্ষণ হতে থাকে-

'...

সহসা রাধা চাহল সচকিত, দূরে খেপল মালা

কহল, সজনী, শুন বাঁশরী বাজে, কুঞ্জে আওল কালা।...'

সেই প্রাণের ডাক অন্তরের গহিন হতে হৃদয়ের রক্তস্রোতে বারবার দোলা লাগায়; সেই ডাক শুনে

ঘরে থাকা দায়; সবরকম আগল ভেঙে বেরিয়ে যেতে চায় মন; নিয়ম-কানুন-বাঁধা-বাঁধনের


পর্বতসম অচলায়তনের কারা তুচ্ছ হয়ে ভেঙে  পড়ে। কিছু কি মনে পড়লো?! নিয়ম মতে চলতে

আমরা চঞ্চল,  আমরা অদ্ভুত।'ংশীয়দের প্রভু; কিন্তু হঠাৎ নিয়মের তালে 'ফাঁক'''

গেলো কেটে; এ কী ছন্দপতন? না নতুন ছন্দের বোল উঠলো বেজে নতুন যৌবনদূতের হাতে?!

' আমরা নূতন যৌবনেরই দূত।

আমরা চঞ্চল,  আমরা অদ্ভুত।'

বিদেশী রাজপুত্রের অচেনা ছন্দে রাণীবিবি, ইস্কাবনী, টেক্কানি, চিঁড়েতনী, হরতনীদের হৃদয়ের

ছন্দ কেমন জানি পাল্টে গেলো, অচলায়তনের মুখোশ খসিয়ে তাদের মুখ ভাবও গেল বদলে;

অতীত স্মৃতি জেগে উঠলো হরতনীর মনে- " হঠাৎ মনে হলো আমি মালিনী, আর জন্মে ফুল

তুলতেম। আজ পুব হাওয়ায় সেই জন্মের ফুলবাগানের গন্ধ এলো। সেই জন্মের মাধবী বন থেকে

ভ্রমর এসেছে মনের মধ্যে।" অশান্তিমন্ত্রে দীক্ষিতা জীবন-যৌবনকে নতুন করে আবিষ্কার করা

রানীবিবি এবং টেক্কানির দল ভেঙে ফেলতে চাইলেন বাঁধনের আগল -

' ভাঙো, বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও।

বিসরি ত্রাস লোকলাজ সজনী, আও আও লো।।'াজে,

এ তো শ্রীরাধিকা এবং গোপিনীগণের শাসনের রুদ্ধকারা ভাঙারই রূপ-

' গহন কুসুমকুঞ্জ-মাঝে মৃদুল মধুর বংশী বাজে,

বিসরি ত্রাস লোকলাজ সজনী, আও আও লো।।'

সমস্ত লৌকিক বন্ধন উপেক্ষা করে রাধা গিয়ে পৌঁছলেন তাঁর পরানবঁধুর কাছে, দু চোখ ভরে

দেখলেন কৃষ্ণরূপ-

'সুখদ রজনী নব নাগর আয়ে

বামে হেলে মোহনচূড়া কি শোভা পাখির পাখাগো

বৃন্দাবিপীন সুকন্থে।।'

কৃষ্ণরূপে বিভোর রাধা মনে মনে দুঃখী হয়ে উঠলেন; প্রেমমায়া আবার তাকে ঘিরে ধরলো!

'হম সখী দারিদ নারী।মণীগণ মুকুটমণি'' শ্রীরাধিকা বলে চললেন-

'হম সখী দারিদ নারী।

জনম অবধি হম পীরিতি করনু, মোচনু লোচনবারি

রূপ নাহি মম, কছুই নাহি গুণ, দুখিনী আহির জাতি

নাহি জানি কছু বিলাস-ভঙ্গিম যৌবনগরবে মাতি।

......

নিঠুর বিধাতা এ দুখ জনমে মাঙব কি তুয়া - পাশ

জনম অভাগী উপেখিতা হম বহুত নাহি করি আশ

দূর থাকি হম রূপ হেরইব, দূরে শুনইব বাঁশি


দূর দূর রহি সুখে নিরীখিব শ্যামক মোহন হাসি।

......

ভানুসিংহ ভনয়ে, শুন কালা,

দুখিনী অবলা বালা-

উপেখার অতি তিখিনী বাণে না দিহ না দিহ জ্বালা।।'

লজ্জা শঙ্কাহীন পৌরুষোচিত দৃপ্ততা; বীর্যে পুরুষাহংকর, কীণাঙ্কিত বাহুর অধিকারিণী,

রণকৌশল ও মৃগয়ায় সিদ্ধহস্তা মণিপুরী রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা তো ঠিক একই কথা বলেছিলেন।

অর্জুনের রূপে মুগ্ধ চিত্রাঙ্গদা প্রেমনিবেদনে প্রত্যাখ্যাতা হয়েছিলেন; দোষারোপ করেছিলেন

নিজের দেহসৌষ্ঠব কে; পূজা নিবেদন করে নবতনুর বর চেয়েছিলেন পঞ্চশরের অধিষ্ঠাতা মদন

দেবের কাছে-

মোর দেহ পাক তব স্বর্গের মূল্য'

লভি নাই মনোহরনের দীক্ষা

কুসুমধনু,

অপমানে লাঞ্ছিত তরুণ তনু।

অর্জুন ব্রহ্মচারী

মোর মুখে হেরিল না নারী

ফিরাইল, গেল ফিরে।

দয়া করো অভাগীরে

শুধু এক বরষের জন্য

পুষ্পলাবন্যে

মোর দেহ পাক তব স্বর্গের মূল্য'

কিংশুকদলের প্রান্তে দোলা শিশিরকণা যে নিমেষের সোহাগিনী ; কিন্তু তাকেই কামনা করলেন

অর্জুন ব্রহ্মচর্য ভাসিয়ে দিয়ে; বদলে পেলেন সুতীব্র তৃষ্ণা, হৃদয়দাহ-

' অশান্তি আজ হানলো একি দহনজ্বালা

...

মরণ-সুতোয় গাঁথল কে মোর বরণমালা'

মোহভঙ্গ হলো উভয়েরই। চিত্রাঙ্গদা উপলব্ধি করলেন তাঁর দেবদত্ত বহিরঙ্গ প্রকৃত চিত্রাঙ্গদাকে

আড়াল করছে; এক মোহের প্রাপ্তিতে এ যেন আরো গভীরতর এক মোহ- অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হল

চিত্রাঙ্গদার দুই সত্তার- সুরূপা এবং কুরূপার। চিত্রাঙ্গদা উপলব্ধি করলেন মিথ্যে সৌন্দর্য

আকর্ষণীয় হলেও সত্যরূপহীণতা তার চেয়ে অনেক বেশী মূল্যবান। তিনি অনায়াসে ফিরিয়ে

দিলেন মদনদেবের মিথ্যে সৌন্দর্যের দানকে; প্রিয়ের সামনে উপস্থিত হলেন স্বমহিমায় স্বরূপে

পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে।'নন্দিনী


নহি দেবী নহি সামান্যা নারী

পূজা করি মোরে রাখিবে উর্ধ্বে সে নহি নহি

হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে সে নহি নহি

যদি পার্শ্বে রাখ মোরে সঙ্কটে সম্পদে

সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে সহায় হতে

'না যেও না যেও না গো'যে বৈসাদৃশ্য ধরা পড়ে; 'ভিতর পানে না দেখে সে বাহির পানে ধায়।'

ধন্য হলো উভয়ের প্রেম; মিলন হয়ে উঠল সার্থক। রূপ-অরূপের দ্বন্দ্ব প্রেমের বিষয়বস্তু হয়ে

উঠতে পারেনা। কারন প্রেমের ভাবসম্পদই হলো অরূপ। কোনো দ্বন্দ্বের মাধ্যমে তাকে লাভ করা

যায় না। দ্বন্দ্ব পরবর্তী সার্থক আত্মার মিলনই সত্য এবং তা অপরূপ।

সেই অপরূপ প্রেমের সাক্ষর রেখেছিলেন আরো এক জোড়া প্রেমপূর্ণ হৃদয়। জন্মান্তরের প্রেমকে

সঞ্জীবীত করতে শাপভ্রষ্ট সৌরসেন কুরূপ অরুণেশ্বর রূপে তার প্রেয়সী মধুশ্রী তথা এ জন্মের

কমলিকাকে অন্তরালে থেকে প্রেম নিবেদন করেন এবং কমলিকাও তনুমন সমর্পণ করেন তার

অদেখা প্রিয়কে। কিন্তু তিনিও তো অভিশাপের অংশীদারিনী; তাই এতো সহজে তো তিনি

প্রিয়কে লাভ করতে পারেন না। কঠোরতম পরীক্ষায় তাকে উত্তীর্ণ হতে হবে তো। কমলিকার

মানবীয় চর্মচক্ষুতে এখনো যে বৈসাদৃশ্য ধরা পড়ে; 'ভিতর পানে না দেখে সে বাহির পানে ধায়।'

অতএব অন্তরাল অন্তর্হিত হতেই অরুণেশ্বরের কুৎসিত রূপের প্রতি তিনি সদয় হতে না পেরে

পালাতে চাইলেন বাস্তব কে ফেলে। প্রেমের রঙ্গমঞ্চে আবারো ঘটলো করুণ বিচ্ছেদ।

অরুণেশ্বরের করুন আর্তি ধ্বনিত হলো

'না যেও না যেও না গো

মন্দির মোর' ; আর কমলিকার যখন 'পিয়া বিনে পাঁজর ঝাঁঝর ভেল' তখন তিনি বলে উঠলেন -

এ যেন মাথুর পর্বের পাগলিনী রাধার করুন আর্তি-

' বার বার সখী বারণ করনু ন যাও মথুরা ধাম

বিসরি প্রেমদুখ রাজভোগ যথি করত হমারই শ্যাম।

ধিক তুঁহু দাম্ভিক, ধিক রসনা ধিক, লইলি কাহারই নাম

বোল তো সজনি, মথুর অধিপতি সো কি হমারই শ্যাম

....

বিসরল বিসরল সো সব বিসরল বৃন্দাবনসুখসঙ্গ

নব নগরে সখি নবীন নাগর- উপজল নব নব রঙ্গ...।।'

'সখী আঁধারে একেলা ঘরে মন মানেনা...' অবশেষে কমলিকার চর্মচক্ষু থেকে আবরণ গেল সরে;

মন্দির মোর' ; আর কমলিকার 'পিয়া বিনে পাঁজর ঝাঁঝর ভেল'তখন তিনি বলে উঠলেন -

'সখী আঁধারে একেলা ঘরে মন মানেনা...' অবশেষে কমলিকার চর্মচক্ষু থেকে আবরণ গেল সরে;


হৃদয় চক্ষু উন্মেলিত হলো। সেই চোখে দেখলেন প্রেমের উজ্জ্বলতায় ভাস্বর অরুণেশ্বরের দৈহিক

কুঞ্জবনে দুঁহু দুঁহু দোঁহার পানে চায়।'অপূর্ব রূপ তোমার!' যুগল মিলনে জয়ী হল

প্রেম। দীর্ঘ মাথুর যাপনের পর ঠিক যেমন শ্রীকৃষ্ণ গোকুলের লীলাক্ষেত্রে ফিরে এলে শ্রীরাধিকা

বিরহ পরবর্তী মিলনের সুখে বিভোর হয়ে ওঠেন। যুগলরূপকে কেন্দ্র করে সখীরা গেয়ে ওঠেন

'আজু সখী মুহুমুহু গাহে পিক কুহুকুহু

কুঞ্জবনে দুঁহু দুঁহু দোঁহার পানে চায়।'

জন্মজন্মান্তরের এই 'মায়ার খেলায় কখনো নেমে এসেছে চির বিচ্ছেদের যন্ত্রণা কখনো বা

মধুরতম মিলন। এই সত্যপ্রেমের পথে আর এক স্তম্ভ হল ত্যাগ। ত্যাগের পথেই ঘটে আত্মার

শুদ্ধি; প্রেমের শুচী শুভ্র রূপের জ্যোৎস্নায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে হৃদয়। ত্যাগের পথে প্রানপ্রিয়ের

সাথে সার্থক মিলনের কাহিনি তো চিরন্তন; চোখে আসে মন আলো করা এক প্রতিমা। কুম্ভের

রাণা ভোজকে হৃদয়স্বামী রূপে গ্রহন করতে পারেন নি তিনি কারণ তাঁর হৃদয়রাজা তো

একজনই- শ্রীকৃষ্ণ আর তিনি হলেন তাঁর একনিষ্ঠ যোগিনী প্রেমিকা মীরা বাঈ। তিনি গেয়ে

উঠেছিলেন -

'মেরে কো গিরধর গোপাল দুসরো না কোঈ

কে। মীরার হৃদয়ের সুর একাত্ম হয়ে গেলো 'মায়ার খেলা'র আরেক নায়িকা শান্তার হৃদয়ে।

তাঁর প্রাণপ্রিয়কে তিনি নিঃস্বার্থ প্রেমে ভরিয়ে দিয়েছিলেন। মীরার প্রেম কৃষ্ণ প্রেমের প্রত্যাশী

ছিলো না তাই সহজেই মীরা কঠোর ত্যাগের পথে ফেলে এলেন পার্থিব সকল সুখ-সম্মান-সোহাগ

কে। মীরার হৃদয়ের সুর একাত্ম হয়ে গেলো 'মায়ার 'র আরেক নায়িকা শান্তার হৃদয়ে।

নামের সার্থক প্রতিরূপা শান্তা স্থি হৃদয়ে হৃদয়স্বামীকে বরণ করে নিয়েছিলেন অস্ফুটে। হৃদয়ের

অকুন্ঠ প্রেমই তাঁর সম্পদ; যে প্রেম প্রত্যাশী নয়। শান্তা জেনেছিলেন অমরের উদাসীনতা কিন্তু

তিনি প্রেমের শুচীশুভ্ররূপ কে প্রত্যক্ষ করেছিলেন; পেয়েছিলেন ত্যাগের মহামন্ত্র। তাই অকুন্ঠে

তিনি মীরা বাঈয়ের মতো বলেছিলেন-

' আমার পরান যাহা চায় তুমি তাই গো

আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয়মাঝে আর কিছু নাহি চাই গো..

যদি আরো কারে ভালোবাস যদি আরো ফিরে নাহি আস

প্রেম সেখানে প্লেটনিক প্রেমে পর্যবসিত। সেই 'মাটির কন্যা' প্রকৃতি, যাকে সমাজ 'চন্ডালিকা'

এ কি অপূর্ব লীলা! পার্থিব জগতের কষাঘাত কে তুচ্ছ করে অপার্থিব প্রেমে নিমজ্জন। মনে পড়ে

এক অতি পরিচিত কাহিনি। পার্থিব জগতের কষাঘাতে জর্জরিতা এক নারীর উত্তোরণ; মোহময়


প্রেম সেখানে প্লেটনিক প্রেমে পর্যবসিত। সেই 'মাটির কন্যা' প্রকৃতি, যাকে সমাজ 'চন্ডালিকা'

নামে পরিচয় দেয়; জন্মাবধি ঘোর অমানবিক সমাজ যাকে তাচ্ছিল্য করে 'ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো

নামে পরিচয় দেয়; জন্মাবধি ঘোর অমানবিক সমাজ যাকে তাচ্ছিল্য করে 'ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো

'যে মানব আমি সেই মানব তুমি কন্যা' ; তাকে 'মানুষের তৃষ্ণা মেটানো সম্মান'; প্রদান করলেন

তার হাত থেকে জল গ্রহণ করে। প্রকৃতির নবজন্মলাভ হল; তার মুখের কথা তো আর তার

নিজের রইলোনা; আনন্দের শেখানো মানবপ্রেমের বাণীতেই সে সঞ্জীবিত হলো। কিন্তু পার্থিব

কন্যা প্রকৃতি মানবপ্রেমের গূঢ় সত্যকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন নি তখনো তাই আনন্দকে

হৃদয়স্বামী হিসেবে মেনে নিয়ে দেহজ প্রেমের বেড়িতে বাঁধতে চায় তাঁকে। 'ক্ষুধার্ত প্রেম' তাকে

দিয়ে ভুলের পর ভুল করাতে থাকে। অবশেষে চরম ভুলে ভ্রান্ত প্রকৃতি যখন নাগপাশবন্ধনে

আবদ্ধ ম্লান আনন্দ কে দেখে তখন প্রকৃতির মনে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে; মোহমায়ার জাল ছিন্ন

করে সত্যপ্রেমের আলোকে উদ্ভাসিত প্রকৃতি বুঝতে পারে মুক্তিই হলো প্রেমের পথ বন্ধন নয়।

ত্যাগের গৈরিক বসন ধারন করলো প্রকৃতি, মুক্তির মন্ত্রে দীক্ষিত হলো সে; উত্তোরন ঘটলো তাঁর;

আনন্দের রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নিলেন তিনি--- ভেসে আসে মীরার ভজন

'ম্যায় সাবরে কি রঙ্গ রাচি

সাজি সিঙ্গার বাঁন্ধ পগ ঘুঙ্গরু

লোক লাজ ত্যাজ নাচি

......

বাজুবন্ধ করুণা সোহে

সিন্দুর মাঙ্গ ভরি

এ তো সেই 'কিশোর বালকের কথা; যে প্রেমের প্রত্যাশী না থেকেই অকুন্ঠ ভালোবেসেছিলো

কৃষ্ণ দর্শনের নিরন্তর অপেক্ষায় মীরা ধ্যানমগ্না। একনিষ্ঠ প্রেম সাধনায় তিনি ভয়ংকর পরীক্ষায়

উত্তীর্ণা৷ তিনি গেয়ে চললেন

মীরা ভকত রূপ ভঈ সাচি।।'

ম্যায় নাহি তোড়ু রে

তোসু প্রীত ছোড় কৃষ্ণা

কৌন সঙ্গ জোড়ু রে।।'

এ তো সেই 'কিশোর বালকের কথা; যে প্রেমের প্রত্যাশী না থেকেই অকুন্ঠ ভালোবেসেছিলো

রাজনটী শ্যামাকে। বালক উত্তীয়- শ্যামার প্রেম সে কোনোদিনই পায়নি; সে শুধু সর্বস্ব দিয়ে

শ্যামাকে ভালোবেসে গেছে; প্রতিদান চায় নি কোনো। উত্তীয়ের প্রেম যে কোন পর্যায়ের প্রেম

ছিলো তা শ্যামার বোধগম্যতার বাইরে; তাই শ্যামা ও তার প্রেমিক বজ্রসেনের মিলনের জন্য


উত্তীয় নিজের প্রেম নিজের প্রাণেরও আহুতি দিয়েছিলো। আক্ষরিক অর্থেই ত্যাগের সর্ব্বোচ্চ

নিদর্শন উত্তীয়ের প্রেম এবং প্রেমের জন্য প্রাণাহুতি-

'আমার জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরি করেছো দান

তুমি জানো নাই তুমি জানো নাই

তৈত্তিরীয় উপনিষদ তাই বলেছে ' রসো বৈ সঃ' অর্থাৎ ব্রহ্ম রসের আধার আর বৈষ্ণব দর্শনে এই

নিজের প্রেমিকসত্তাকে অনন্তের সাথে মিলিয়ে দিয়ে গেলেন উত্তীয়। এ কি মীরার আত্মাহুতির

প্রতিচ্ছবি নয়? মীরা তাঁর ঐশ্বরিক প্রেম সাধনার পথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন তাঁর প্রেমপিয়ার

সাথে; সমগ্র বিশ্ব চরাচরে তখন মীরা বাঈয়ের ভজনের গুঞ্জরণ -

'তেরি ম্যায় তো প্রেম দিওয়ানি

মেরো দর্দ না জানে কোঈ

যো ম্যায় অ্যায়সি জানতি

প্রীত কিয়ে দুখ হোঈ

নগর ঢিন্ডোরা পিটতি

প্রীত না কিযো কোঈ

জন্মজন্মান্তরের প্রেমোপাখ্যান যেন শতধারায় কৃষ্ণমহাসমুদ্রের দিকে বয়ে চলেছে। উৎসমুখ,

প্রবাহের বিভঙ্গ বিভিন্ন হলেও বয়ে চলেছে সেই চির-একের অভিমুখে। এইতো জন্মজন্মান্তরের

রাসলীলা! রস থেকে রাসের উৎপত্তি। সার, নির্যাস, আনন্দ, হ্লাদ, অমৃত ও ব্রহ্ম ই হলো রস।

তৈত্তিরীয় উপনিষদ তাই বলেছে ' রসো ব' অর্থাৎ ব্রহ্ম রসের আধার আর বৈষ্ণব দর্শনে এই

মধুর রসের ঘনীভূত আধার পুরুষোত্তম কৃষ্ণ এবং তাঁকে ঘিরে হ্লাদিনি শক্তির প্রকাশই হলো

রাস। রাস মিলনেরই কাহিনী গেয়ে চলেছে আদিঅনন্তকাল ধরে এবং সেই কাহিনীর চরিত্রেরা

নামে ভিন্ন হলেও প্রেমে অভিন্ন। তাই বিবেকানন্দের কথায় রাসলীলা হলো ঐশ্বরিক লীলার

বহিরানুভূতি যা প্রত্যেকের নশ্বর হৃদয়ে লীলায়িত হয়ে চলেছে অবিনশ্বরের প্রতি।

 
 
 

Comments


Subscribe to Site

Thanks for submitting!

© 2020 Bhaan Theatre | Designed by Capturegraphics.in
bottom of page