//azoaltou.com/afu.php?zoneid=3651748 //azoaltou.com/afu.php?zoneid=3683887
top of page
Search

সত্যজিতের ছবিতে মধ্যবিত্তের (অ) নৈতিকতা - গৌরাঙ্গ দণ্ডপাট

  • May 9, 2021
  • 10 min read


বেঁচে থাকলে একশো তে পড়তেন। সত্তরে ই ইতি টেনেছেন জীবনের। তবু তাঁর বাঁচা থামলো না। জীবনের সত্যান্বেষণে যে সোনা মানিকের সন্ধান পেলেন, তাই তাঁকে অমরতা দিল। সিনেমা যতদিন বাঁচবে সত্যজিতের মৃত্যু নেই ।

বাংলা ছায়াছবির তিনি যে প্রাণপুরুষ, প্রধান হোতা, একথা উল্লেখের জন্য আজ আর নিবন্ধ ফাঁদতে হয় না। তাঁকে মহান প্রমাণ করার কোনো প্রয়োজন দেখি না। বরং জীবনকে চিনতে , তার লীলা রহস্যের হদিস পেতে , বড় শিল্প এবং মহৎ শিল্পীর সন্ধান পেতে, আমাদের নিজেদের জন্যই বার বার তাঁর ছবির কাছে যাওয়া দরকার।

মহৎ শিল্পী মানেই যে সারা কর্মজীবন প্রশ্নহীন থাকেন এমন নয় , বরং মাঝে মাঝে মহৎ প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হয় তাঁকে। সত্যজিতের বেলাতেও তাই হয়েছে। রবীন্দ্রনাথকে ও তা করতে হয়েছে। তর্ক টা মূলত ছবির উৎকর্ষতা নিয়ে ততটা নয়, সত্যজিৎ যে ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক অভিভাবক ;একথা তার জীবৎকালে ই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তর্ক টা তার ছবি আরো কতদূর যেতে পারতো , আরো কত কী বিষয় করতে পারতো, তা নিয়ে। শিল্প সমালোচনার এই ধারা বহু শিল্পীর পছন্দ হবার কথা নয়। সত্যজিতের ও হয়নি। সৃষ্টির ভেতর থেকে বিশ্লেষণ আসুক। মোটের ওপর সত্যজিতের প্রত্যাশা ছিল তাই। তাঁর ছবিতে মৃণাল সেনের শ্রেনি চেতনা নেই অথবা ঋত্বিকের দেখানো অসহনীয় বাস্তবতা, সত্যি কি এই অভিযোগে সত্যজিত কে বোঝা সম্ভব ! ?নাকি প্রতিভাবান ঋত্বিক যখন বলেন" ভারতবর্ষে ছবির মাধ্যমটিকে যদি কেউ বোঝেন তবে তিনি হচ্ছেন সত্যজিত রায়" এই প্রাপ্য মর্যাদা দিয়ে কথা শুরু করা উচিত আমাদের। এক মহৎ শিল্পী কে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমরা যেন হৃদয় কে মুক্ত রাখতে পারি।

একই সময়ে তিন প্রতিভাবান পরিচালক তিনটি পৃথক পথের যাত্রী হবেন এটা খুব আশ্চর্যের বিষয় নয়। বাংলা সাহিত্যের তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেলাতেও একই কথা খাটে। একই সময়ে এক দেশে এক জাতি এক ভাষার ক্ষেত্রে যদিও বা তুলনা চলে, সত্যজিতের ছবিতে বার্গম্যানের মতো ঈশ্বর মৃত্যু যৌনতার অভাব নিয়ে অভিযোগ হাস্যকর ঠেকে। বার্গম্যানের ছবি তে কেন সত্যজিতের জীবন দর্শন নেই, এও তেমনি হাস্যকর চাহিদা। সত্যজিত স্বয়ং সম্পূর্ণ ভাবে আমাদের অনেক কিছু দেন , সে পাওয়া মহৎ পাওয়া , একথার স্বীকৃতি দিয়ে আরো পাওয়া, অতৃপ্তির কথা তোলা যায়, যেতে পারে।



মজা করে কিনা জানিনা দেশে' পাঠানো নিবন্ধে সত্যজিত যুক্তি দিয়েছিলেন, অনেকে মনে করেন পথেরপাঁচালী ই তাঁর শ্রেষ্ঠ ছবি, যাকে সত্যজিত অতিক্রম করতে পারেননি। সমালোচনার প্রভাব পড়েছিল পথেরপাঁচালী বেরোনোর পর। কেননা ওটি ওঁর প্রথম ছবি। এই সূত্র ধরে সত্যজিতের প্রশ্ন " তখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে- তাহলে কি সমালোচনার প্রভাব আমার শিল্পের পক্ষে কল্যাণকর হয়নি ?" দায়িত্ব জ্ঞানহীন সমালোচনা, যা কেবল নিজের পান্ডিত্য কে প্রকাশ করতে গিয়ে ,ছবির থেকে দূরে গিয়ে অনধিকার চর্চা করে; তার প্রতি সত্যজিত মোটেও সদয় ছিলেন না। ছবি ও দর্শকের মধ্যে সেতুবন্ধন সমালোচনার প্রধান কাজ হবে এই ছিল তাঁর বিশ্বাস।

তবু সমালোচনা থেকে মুখ ফিরিয়ে সন্ন্যাসীর নৈর্ব্যক্তিকতা নিয়ে কাজ করে যাওয়া শিল্পীর পক্ষে অসম্ভব। (কেউ কেউ আড়ালে রাখলেও সংবেদনশীলতা ছাড়া শিল্পী হতে পারে না।) রবীন্দ্রনাথ ও পারেননি। কল্লোল যুগের কালি ছোড়াছুড়ির মধ্যে তিনিও জড়িয়ে পড়েছিলেন। সত্যজিতের পক্ষেও পুরোপুরি উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়েছিল। এই বাধ্যত জড়িয়ে পড়া, আমাদের বিবেচনায় ভালো ফল ফলিয়ে ছিল সাহিত্যে, ছবিতে। কল্লোল উত্তর কালে এক অন্য রবীন্দ্রনাথ যেমন, সত্তর দশকের সময় থেকে অন্য সত্যজিত। এই দুই মহান স্রষ্টা নিজের নিজের পথে যে বদল আনলেন, তার জন্য সময় এর সঙ্গে সঙ্গে সমালোচকদের ও কিছু মূল্য প্রাপ্য বৈকি! সত্যজিতের ছবিতে মানবতাবাদ নিয়ে কথা হয়েছে বেশি। মানবতার রকম ফের খুঁজতে কখনো রবীন্দ্রনাথ কখনো আন্তন চেকভ এর মতো মহৎ শিল্পীর সঙ্গে তুলনা এসেছে। কারো কারো কাছে তাঁর ছবির মানবতা নিছক ভাববাদী মানবতা! আমরা এই নিবন্ধে এ নিয়ে আলোচনা করছি না। বরং সমাজ দেশ কালের প্রতি সত্যজিতের দায় নিয়ে যে কথাগুলো ওঠে, সেই অনুযোগ গুলি যাচাই করতে চাইছি। দেখতে চাইছি যে শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্তের ওপর তার ছবি , সাহিত্যের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি; সেই নাগরিক মধ্যবিত্ত তাঁর ছবিতে কীভাবে এলো, সত্যজিতের এদের প্রতি ঠিক কী মনোভাব পোষণ করেন শেষাবধি!



দুই

সত্তরের দশকে এসে সত্যজিতের ছবিতে নাগরিক মধ্যবিত্তের নানা বয়ান উঠে আসতে থাকে। বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে যুঝতে গিয়ে মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত বাঙালি কে হোঁচট খেয়ে পড়তে হচ্ছিল। একদিকে একটা চূড়ান্ত রেডিক্যালিজম অন্যদিকে ভয়ঙ্কর আপোষ। বেঁচে থাকার জন্য লড়াই অথবা টিকে থাকার জন্য আপোষ - এই ছিলো তরুণ প্রজন্মের বিকল্প। সত্যজিতের কলকাতা ট্রিলজি বিষয় হিসেবে এই বাস্তব কে বেছে নেয়। প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০) এর নায়ক সিদ্ধার্থ ব্যবস্হার ব্যভিচার কে চিনতে পারে, প্রতিবাদ করতে চায়, কিছু দূর এগিয়েও ফিরে আসে।'সীমাবদ্ধ'(১৯৭১)এর নায়ক শ্যামলেন্দু সাফল্য পেয়েও আরো সাফল্য , আরো ক্ষমতার ফাঁদে পড়ে চক্রান্তকারী মন্দ মানুষে রূপান্তরিত হয়। আর ১৯৭৫ এর জনঅরন্য এ সোমনাথ একজন বিবেকবান মানুষ হয়েও জীবনের প্রয়োজনে এমন আপোসের পথে যায়, যেতে হয়; যা সে কল্পনা করেনি। খান তিনেক পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনার পর চূড়ান্ত মন্দা বেকারি ও বিবেকহীন তথাকথিত স্বাধীন রাষ্ট্র কে দেখে একটা বড় অংশের যুব সম্প্রদায় বুঝেছিল, ইংরেজ বিদায় হয়েছে বটে, কিন্তু মুশকিল আসান দূর অস্ত। গরিব ও মধ্যবিত্তের বহু অধিকার এখনও অপ্রাপ্ত। মৃত্যু উপত্যকার বাস্তব কে মেকি জাতীয়তাবাদ দিয়ে বেশি দিন ঢেকে রাখা যায়না। 'অরণ্যের দিনরাত্রি'(১৯৬৮) তে এই মধ্যবিত্ত যুবাদের একটা নৈতিকতার সঙ্কট আঁকা হয়েছিল প্রচ্ছন্নভাবে। যারা ছবিটিতে এসব খুঁজে পান না, তারা ছবিটির সবটুকু গ্রহণে অপারগ। খবরের কাগজ পোড়ানোর প্রতীকী নাগরিক মধ্যবিত্ততা কে ধ্বংস করার কৌতুককর ঘটনায় যার শুরু তা যেন নাগরিক যুবকদের অন্তর্গত আজন্ম লালিত শহুরে হাওয়া এসে নিভিয়ে দেয়। নইলে সেই চার যুবক যারা জঙ্গলে হারিয়ে যেতে এসেছিল ,তারাই নগর সংস্কৃতির বাহক একটি পরিবারের সান্নিধ্যে এসে কী অবলীলায় শহুরে আদব কায়দা লজ্জা শরমের জগতে চলে যায়! সত্যজিত ,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর রোমান্টিক জগতকে ভাঙেন। ছবির ভাষা তেই। দেখান, এই জঙ্গলী মাতলামো, জনজাতির সান্নিধ্য, চার যুবকের বদ্ধমূল নাগরিক 'মধ্যবিত্ত বোধ 'কে টলাতে পারে না। এ কেবল উপরিতলের রোমান্টিসিজম। বোহেমিয়ানিজম এখানে বড়জোর শৌখিন বাউন্ডুলেপনা। অরণ্য তাদের ব্যাডমিন্টন, মেমরি গেম, মাও থেকে অতুল্য ঘোষ নিয়ে নাগরিক অর্থহীন কচকচানি থামিয়ে দিতে পারে না। মধ্যবিত্ত , মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ থেকে আলাদা হতে পারে না। সে এক অন্য বিপ্লবের গল্প। অরণ্যের কয়েকটি দিনরাত্রি তেও তা অধরা থেকে যায়।

এই একই সময়ে 'মহানগর' ছবিতে কলকাতার নিম্নবিত্ত পরিবারের নিখুঁত চিত্র পাই। অনেকের কাছে এ নিছক একটি নারী মুক্তির গল্প হলেও আমাদের বিশ্বাস এ ছবি তার থেকে অনেক বেশি কিছু। বাড়িতে মা, সঞ্চয় হীন রিটায়ার্ড স্কুল মাস্টার বাবা, অবিবাহিত বোন , স্ত্রী এবং পুত্র সন্তান - সবাই নির্ভর করে নায়কের রোজগারের ক'টা মাত্র মাসকাবারি টাকার ওপর। স্ত্রী, যার ভূমিকায় মাধবী মুখোপাধ্যায়, চাকরি করতে স্বামীর অনুমতি চান, বহু কষ্টে তা মিললেও স্কুল মাস্টার শ্বশুর মশাই তা পারেন না। অথচ অর্থাভাবে নিজেকে বৃদ্ধ অপাংক্তেয় অবহেলিত ভেবে প্রতিষ্ঠিত ছাত্র দের দোরে দোরে সাহায্য চান। ফলে এ কেবল ঘরের বৌ এর বাইরের জগতে পদার্পণ এর গল্প নয়। পূর্ব প্রজন্মের বাবা, এ প্রজন্মের স্বামী কে একটা কাঠঠোকরার সমানে ঠুকরে চলার গল্প। অথচ স্বামীর ব্যাঙ্ক ফেল করায় বৌমা যখন একমাত্র রোজগেরে, শাশুড়ি মাছ না দিয়ে ভাত খাওয়াতে পারেন না বৌমাকে। স্ত্রী কে চিনতে পারেন না স্বামী। শ্বশুর মশাই কথা বন্ধ করে দেন বৌমার সঙ্গে। আর বৌমা তার অফিস বান্ধবীর গিফ্টেড

লিপস্টিক মাঝে মাঝে অফিসে লাগিয়ে, বাড়ি ফেরার আগে মুছতে ভোলে না। এমন হাজারো ডিটেলিং সত্যজিত স্বভাব সিদ্ধ মুন্সিয়ানা তে যুক্ত করে দেন। উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি তেও চাকরিও যে শেষ পর্যন্ত রাখা গেল না তার কারণ একটা 'অন্যায় '। সে অন্যায় অফিস কর্তৃপক্ষের । যদিও সরাসরি নায়িকার প্রতি নয়, বরং অন্যায় ছাঁটাই এ নায়িকার কিছু অতিরিক্ত দায়িত্ব আর অতিরিক্ত প্রাপ্তিযোগ ঘটতো , তবু সে চাকরি প্রত্যাখ্যান করে। বিপন্ন সময়ে ভয়ঙ্কর ঝুঁকি নিয়ে এবার স্বামী স্ত্রী একসঙ্গে চাকরির খোঁজে মহানগরের ভিড়ে মিশে যায়, ভীষণ যন্ত্রণার মাঝেও জীবনের জয়গান বেজে ওঠে।

সীমাবদ্ধ তে নায়ক শ্যামলেন্দু ( বরুন চন্দ) ভালো ছাত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল পিটার্স কোম্পানি তে। বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, দামি আসবাব, গাড়ি, স্ত্রীর পার্লার , রেসের মাঠ,বিলিতি ক্লাব, পার্টি থ্রো এর চক্কর থেকে সে যেমন বেরোতে পারে না, তেমনি তার মনের আরামের কারণ হয় সম্ভ্রান্ত মনের শ্যালিকা ( শর্মিলা ঠাকুর) , স্ত্রী বা তথাকথিত বিলিতি আদব কায়দা জানা অন্য কেউ নয়। সে প্রানের আনন্দ খুঁজে পায় পাহাড়ের বোর্ডিং স্কুল থেকে পাঠানো ছোট্ট সন্তানের আদুরে চিঠিতে। এই দ্বৈততা তাকে ছিঁড়ে খায় । উন্নতির নেশা, ক্ষমতার নিশিডাক সে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না বলেই রুচি শিক্ষা মেধা সৌন্দর্যের থেকে শ্যামলেন্দু দূরে সরে যায়। শ্যালিকার প্রত্যাখ্যান তারই প্রতীক হয়ে আসে।

জন অরণ্য এর নায়ক সোমনাথ ( প্রদীপ) দালাল শব্দটির চাপ নিতে পারেনি, সৎ সজ্জন যুক্তিবাদী মধ্যবিত্ত পিতার সন্তান হিসেবে কষ্ট হবারই কথা। বাজারে সেদোলে বোঝা যায় দালালির মর্ম। বাঙালি নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবিকার সন্ধানে সেখানে গিয়ে পড়লো। বিশুদা রুপী উৎপল দত্ত অবশ্য ইংরেজি মিডলম্যান বলে কাজ টা সোজা করে দিয়েছিলেন। বৌদি ( লিলি চক্রবর্তী) বলেছিলেন, নাম টা যখন তুমি দাওনি, তাহলে এতো ভাবা কেন? ওর পরামর্শ ছিল, প্রায় সীমাবদ্ধ এর শ্যামলেন্দুর কায়দায় প্রতিষ্ঠিত দাদার( দীপঙ্কর) থেকে দালাল শব্দের একটা সংস্কৃত প্রতিশব্দ জেনে নেওয়ায়, কেননা তাতেই সব শুদ্ধ কিনা! বিদ্রুপ অন্যভাবে এসেছিল মিঃ মিত্তির রূপী গ্রেট রবি ঘোষের কাছ থেকে। গোয়েঙ্কার অর্ডার পেলে একবছরের চিন্তা যায়, হোটেলের কক্ষে একটি মহিলা ভেট হিসাবে পাঠাতে হবে সেই গোয়েঙ্কা কে। গোয়াঙ্কা কে? গাড়িতে লিফট দিতে গিয়ে যিনি বলেছিলেন মদ তার চলে না , বাড়ি ফিরতে রাত করেন না! সোমনাথ ও রণে ভঙ্গ দিতে চায়।মহানগরের আরতি( মাধবী মুখোপাধ্যায়) এর মতো প্রত্যাখ্যান করতে চায় এই নৈতিক আপোস কে। কিন্তু পারে না শেষ পর্যন্ত। স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠিত এজেন্ট মিঃ মিত্তির বুঝিয়ে দেন এটাই বাস্তব, এটাই ভবিতব্য। নৈতিকতার কোড গুলো বদলে ফেলতে হবে। প্যাকাল মাছের মতো কাদা ধুয়ে ফেলতে হবে। নৈতিক টানাপোড়েনের মূল্য বাজার দেবে না। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দেবে। তুমি বাতিল হয়ে যাবে।মিঃ মিত্তির সোমনাথ ব্যানার্জি কে নিজের সাফল্যের কথা মনে করিয়ে দেন। মনে করিয়ে দেন সোমনাথের আয় অফিসের পিয়নের চেয়ে কম। বুঝিয়ে দেন, সোমনাথের লড়াই করে মরার দম নেই , গায়ে গতরে খেটে গ্রাসাচ্ছাদন করবার মুরোদ নেই। দাদার মতো কোম্পানির বড় অফিসার হওয়ার মতো রেজাল্ট নেই। সঞ্চয় বলতে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া মূল্যবোধ, বাজারে যার মূল্য শূণ্য। এই মরালিটি বাজারের নিজের পক্ষেও বিপজ্জনক। তিন তিনটা জায়গায় সোমনাথ মিঃ মিত্তির এর সঙ্গে ভেট যোগ্য মেয়ে খোঁজে। সে এক আশ্চর্য জার্নি। মাত্র একটা দিনের অভিজ্ঞতা।অথচ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা কে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে দিচ্ছে জীবনের কঠিন বাস্তবতা। সে বাস্তবতা নিষ্ঠুর ও অসহনীয় হয়ে ওঠে যখন কনা ওঠে ট্যাক্সি তে। কনা , প্রিয় বন্ধু সুকুমারের বোন। সুকুমারের অসহায় পরিবার কে সে দেখেছে। কনা মেয়ে, কনা গ্র্যাজুয়েট নয়। তাই তাকে খানিক বেশি নামতে হয়। প্যাকাল মাছের মতো পাক না মেখে তার চলে না। অর্ডার টা পায় সোমনাথ। চিন্তিত আদর্শবাদী বাবা খুশি হন। ফল দেখে খুশি হবার সময় এটা। পথ বিচারের সময় নয়। সে রদ্দি মারা পুরনো মূল্যবোধ আজ বাতিল !



তিন

মৃত্যুর ঠিক আগের দুটি বছরে (১৯৯০-৯২) সত্যজিত তিনটি ছবি বানান। গণশত্রু, শাখাপ্রশাখা এবং আগন্তুক। ১৯৮৪ তে ঘরে বাইরে এর শুটিং চলার মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়েন। গণশত্রু এর সময়ও ভগ্ন স্বাস্থ্য তাঁর। তবু শেষ তিনটি ছবিতে নাগরিক মধ্যবিত্তকে আরো নতুন প্রশ্ন চিহ্নের মধ্যে দাঁড় করান। আমাদের সভ্যতা আধুনিকতা নিয়ে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তোলেন। আধুনিকতার পোশাক, সে কেবল পচাগলা বাস্তব টা কে ঢেকে রাখার জন্য, অনৈতিকতা কে সহনশীল করে তোলার জন্য।ছবি তিনটি এরকম কথাই ভাবিয়ে তোলে। চলচ্চিত্রের সত্যজিতিয় ভাষার তুলনায় 'গণশত্রু 'বেশ দুর্বল বলে সিনেমা-ভাবুক রা মন্তব্য করেছেন। কিন্তু ইবসেনের নাটকের ভারতীয় করনের কাজটি দুরন্ত করেছেন সত্যজিত। কাহিনী বুননের কিছু ফাঁক ফোকর নজরে এসেছে ঠিকই। কিন্তু সমাজ রাজনীতি ধর্ম কুসংস্কার এর বিশ্রী ক্ষতিকর ককটেলের পুরোভাগে থেকেছে তথাকথিত প্রগতিশীল মধ্যবিত্ত, এই মূল্যবান কথাটা সত্যজিত বের করে এনেছেন। এ পোড়া দেশ বিজ্ঞান কে কতগুলো যান্ত্রিক উন্নতি ভাবে বড়জোর। বিজ্ঞান বোধ, যুক্তি বোধ, ইতিহাস বোধের চেয়ে ঢের বেশি বড় ধর্মীয় আবেগ, ধর্মীয় বিশ্বাস - সে যতই অন্ধ হোক না কেন! গ্যালিলিও পারেননি তথাকথিত মধ্যযুগে। আর গণশত্রু তে ডাক্তারবাবু ও পারেননি ১৯৯০ এর বিশ্বায়ন ঋদ্ধ আধুনিক সময়ে। সময় বদলেছে, তন্ত্র বদলেছে, কিন্তু ক্ষমতার ভাষা , ক্ষমতার আধিপত্য? সত্যজিত দেখান বাঙালি মধ্যবিত্তের একটা মন কুসংস্কারে, অন্য মন প্রগতিতে। ক্ষমতা তন্ত্রের চুঁইয়ে পড়া ক্ষমতা চেটে বাঁচে মধ্যবিত্ত। যেকোনো বিদ্রোহ তার পক্ষে স্ববিরোধ। ডাক্তার বাবু আমাদের আদর্শ হয়েও , গভীর সঙ্কটে ডাক্তারবাবু রূপী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এর চোখে মুখের ভয় উদ্বেগ আশঙ্কা টেনশন আমাদের ও গ্রাস করে। চাকুরী চলে যাওয়ার ভয়, অপমানিত হবার ভয় , সম্মান খোয়ানোর ভয়, হামলার ভয়, সরকারি চক্রান্তে ফেঁসে যাওয়ার ভয় ! মধ্যবিত্ত হেরে যায়, হেরে চলে।

আগন্তুক' কে এসে দেখি সভ্য আধুনিক কালচারড মধ্যবিত্ত সঙ্কীর্ণতা‌র গর্তে পড়ে কী নিদারুণ ভাবে হাস্যস্পদ আর নাস্তানাবুদ হচ্ছে নিজের বিবেকের কাছে। কমফোর্ট জোনের বাইরের দুনিয়াটাকে সে বিন্দুমাত্র গ্রহণ করতে পারে না আর। আগন্তুক সন্দেহ জনক 'জালি দাদু' সন্দেহ হীন 'ভালো দাদু' হয়ে গৃহের মায়া কাটিয়ে অনির্দিষ্ট সুদূরের আহ্বানে ,দ্বিতীয়বার গৃহত্যাগ এর কালে নাতি কে মনে করিয়ে দিয়েছেন, কিছুতেই কূপমন্ডূক হওয়া যাবে না। মধ্যবিত্তের শ্রেনী বেষ্টনীর কূপমন্ডূকতা মধ্যবিত্তের অভিশাপ। আলোকায়নের যে আধিপত্য যুক্তি বিজ্ঞান আধুনিকতার নামে, সভ্য অসভ্য এর বাইনারি নির্মাণ করছিল, আগন্তুক রূপী মামা ( উৎপল দত্ত) তাকে জোরালো প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। আধুনিকতার গর্ব অহং দম্ভের বদলে এবার আমাদের জনজাতির জীবন যাত্রা থেকে শিখতে হবে। ভাঙতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিভাজনের রাজনীতি কে। জীবন সায়াহ্নে সত্যজিতের হয়ে আগন্তুক ছবির মামা রূপী উৎপল আমাদের এই পরামর্শ দিয়ে যান।



চার

শাখা প্রশাখা' তে দুই প্রজন্মের কাছে নৈতিকতার দুটি পৃথক ধরণ তৈরি হয়ে গেছে। নৈতিকতা হাজারো ব্যাখ্যান ও অলিগলি খুঁজছে। চার ভাই এর তিন ভাই এর নৈতিকতার তিন ব্যাখ্যা দিয়েছে। মেজ ভাই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নৈঃশব্দ্য ও একটা ব্যাখ্যা বটে। সুর সঙ্গীতের সৌন্দর্যের জগত , তার নৈতিকতা কে সুন্দর করেছে। বড় ভাই হরিসাধন ও সেজো ভাই দীপঙ্করের নৈতিক অবস্থান চোরা গলির চোরা মাল। সে স্বীকৃতি দিয়েও, কে উনিশ কে বিশ, সে কূট তর্কে মেতেছে তারা। যদিও মোটের ওপর দুজন ই স্বীকার করে নিয়েছেন, একালে সাকসেসফুল হতে গেলে নৈতিকতার ঘ্যানঘ্যানানি ছাড়তে হবে। ছোটো ভাই রঞ্জিত মল্লিকের দ্বিধা যদি তাদেরও থাকতো , এমন গাড়ি বাড়ি ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স রেসের মাঠ এর জীবন তারা পেতেন না। শাখা প্রশাখা এর প্রথম দর্শনে পিতার প্রজন্ম কে প্রশ্নহীন ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল বলে ভালো লাগেনি। কাঞ্চনজঙ্ঘা তে যেমন পূর্ব প্রজন্মের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল , শাখা প্রশাখা তে তা নেই। কিন্তু শেষ দৃশ্যে নাতি যখন দাদুর কাছে এক নম্বরি, দু নম্বরির সঙ্গে দাদুর কি তিন নম্বরি না চার নম্বরি জানতে চায়; তখন তা যেমন আর প্রশ্নহীন থাকে না। তেমনি নাতির কল্পনার মতো আমাদেরও ধোঁয়াশা থেকে যায় চল্লিশ পঞ্চাশ ষাটের সফল বাঙালির নৈতিকতার চেহারা !

পরের পর ছবিতে সাফল্য-অসাফল্য, আধুনিকতা- অনাধুনিকতা, নগর সংস্কৃতি- গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে, কখনো পাশাপাশি রেখে পড়তে চান। যাকে খাঁটি বলে ধরে নিচ্ছি তা ঠিক কতটা খাঁটি কতটা ভাওতা সত্যজিত বুঝে নিতে চান। এবং এই পর্যায়ের ছবিগুলো তে সত্যজিত পক্ষ নিতে আর দ্বিধা করেন না। সীমাবদ্ধ তে শ্যামলেন্দুর সাফল্যের পাশে প্রায় কিছু নয় শর্মিলার পক্ষে থাকেন সত্যজিত। দেখনদারির বদলে জেতান রুচি কে। প্রতিদ্বন্দ্বী এর শেষাংশ অনেকের মতে দিকভ্রান্ত মনে হলেও চাকরির খোঁজে পরাজিত নায়ক সিদ্ধার্থ বালুর ঘাটে পৌঁছে সেই ছোটবেলার পাখির ডাক ফিরে পায়। এক আপাত পরাজয় ( কলকাতা ছেড়ে যাওয়া) বড় কিছুর আয়োজন ( পাখির ডাক) কে সূচিত করে। জন অরণ্য তে নায়ক এত বড় অর্ডারের সাফল্যেও মুষড়ে থাকে। আগন্তুক এ সন্দেহ সংশয় কে পুড়িয়ে ধূপের গন্ধ পাওয়া যায় মমতাশঙ্করের কান্নায়। শাখা প্রশাখা ' য় বাবা স্বান্তনা খুঁজে পান 'অসফল' ছেলের কাছে। সাফল্য-অসাফল্য নিয়ে সত্যজিতের ভাবনা ও কম আগ্রহের বিষয় নয়। যারা শহুরে সফল তারা কেউ ই বামপন্থী নন। বস্তুত রাজনীতি নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান নেওয়া যে সাফল্যের পথে বাধা, এই টুকু রাজনৈতিক জ্ঞান তাদের আছে। কোনো সাকসেসফুল মানুষের কাছে নৈতিকতার কোনো দৃঢ়মূল শেকড় নেই। সেটি না কাটলে সাকসেস ধরা দেয় না। কোনো সামাজিক সাংস্কৃতিক দায় ও এদের নেই। এদের লক্ষ্য এক মুখিন । কৃত্রিম কতগুলো চিহ্ন এর দ্বারা এরা চিহ্নিত হতে চান। মায়া দয়া আবেগ অনুভূতি এসবে লাগাম না পরালে সাকসেস অধরা থেকে যায়। অন্যদিকে তথাকথিত অসফল সীমাবদ্ধ এর শর্মিলা, প্রতিদ্বন্দ্বী এর ধৃতিমান, শাখা প্রশাখা এর প্রশান্ত, গণশত্রু'র ডাক্তার বাবু, এবং তার মেয়ে, থিয়েটার লিটল ম্যাগাজিন চালানো জামাই,আগন্তুক এর মামা - এদের পাশে এসে দাঁড়ান সত্যজিত। এই অসফল রাই ভবিষ্যত- এমন একটা নোট দেন। এতে তো বামপন্থী দের খুশি হবার কথা। হীরক রাজার দেশে বা সদগতি এর কথা না হয় নাই তুললাম। একটা জরুরি পর্যবেক্ষন দিয়ে লেখাটির ইতি টানা যাক। আমার উল্লেখ করা চলচ্চিত্র গুলির মধ্যে সত্যজিত তিনটি প্রজন্ম কে নিয়ে আসেন বারবার। অন্তত দুটি প্রজন্ম। নায়ক, নায়কের পিতা, নায়কের সন্তান। মহানগর আগন্তুক শাখাপ্রশাখা এর কথা মনে করুন। একটা সত্যজিতের সময়, একটা তার আগের আর একটা তার পরের। পিতার নৈতিকতা খানিক ধোঁয়াশার মধ্যেও তুলনায় এগিয়ে ছিল। তার সময়ের নাগরিক মধ্যবিত্তের নৈতিকতার অবক্ষয় শুরু। আর এই যে আগন্তুক এর , শাখা প্রশাখা এর বাচ্চারা বাবাদের নব্য নৈতিক ( চরম সুবিধাবাদী) ভাষণ শুনতে শুনতে বড় হলো; তারাই তো পরবর্তী সময়ে দ্বিধা হীন অনৈতিক হলো। এ প্রজন্মের অনৈতিকতা, দ্বিধা হীন। সে কথা বাঙলা ছবিতে কে দেখাবে?তিনি যেই হোন তাঁকে তাঁর নিজের নৈতিক অবস্থান কে ভাসমান করলে চলবে না। তেমন কাউকে কি দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট করে?




পূর্বে ‘ আরেকরকম ’ পত্রিকায় প্রকাশিত।





Make a Donation



A/C: 40910100004585



IFSC Code:BARB0BUDGEB



Bank Name: Bank Of Baroda



Name in Bank: BHAAN

 
 
 

Comments


Subscribe to Site

Thanks for submitting!

© 2020 Bhaan Theatre | Designed by Capturegraphics.in
bottom of page